ঈদে মৌলভীবাজারে পর্যটক কম, ব্যবসায়ীরা হতাশ
ঈদে মৌলভীবাজারে পর্যটক কম, ব্যবসায়ীরা হতাশ

ঈদুল আজহার ছুটিতে প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা এসেছেন চায়ের দেশ মৌলভীবাজারে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটক তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়েও হোটেল-রিসোর্টে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। এ নিয়ে হতাশ ব্যবসায়ীরা। তবে পর্যটক কম থাকায় স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ঘোরাঘুরি করতে পেরে খুশি অনেক পর্যটক।

পর্যটক কমার কারণ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে আশানুরূপ পর্যটক না আসায় স্থানগুলো প্রায় পর্যটকশূন্য রয়েছে। ট্রেনের টিকিট সংকট, যাতায়াত জটিলতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং শেষ মুহূর্তে হোটেল-রিসোর্টের বুকিং বাতিলের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী জানান, শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা, ট্রেনের টিকিট সংকট, অতিবৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে এবার প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক আসেননি। ফলে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও আগের বছরের মতো উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পর্যটন কেন্দ্রগুলো

মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, চা-বাগান, খাসিয়াপুঞ্জি, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, পৃথিমপাশা নবাববাড়িসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান।

পর্যটকদের অভিজ্ঞতা

ঈদের পরদিন ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে এসেছেন মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ও চা-বাগানের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থা ভ্রমণে কিছুটা ভোগান্তির কারণ হয়েছে। পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় ব্যাটারি চালিত টমটম ও সিএনজি অটোরিকশার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে আমাদের।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজশাহী থেকে আসা সুমনা বেগম বলেন, ‘ঈদের দিন থেকেই বুকিং ছিল হোটেল। যদিও আসছি ঈদের দ্বিতীয় দিনে। আমার পরিবার নিয়ে এসেছি। এখানকার চা-বাগান, লেক, বনাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখেছি এবং ছবি তুলেছি। চা বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পরিবেশে দারুণ সময় কেটেছে আমাদের।’

ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রিনিউর অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, ‘ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে পর্যটক কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক পর্যটক বাইরে ঘোরাঘুরির পরিবর্তে রিসোর্ট ও কটেজের ভেতরেই সময় কাটিয়েছেন। তারপরও আশা করছি সামনের দিনগুলোতে পর্যটক বাড়বে।’

মৌলভীবাজার পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ‘ঈদে টানা ছুটি থাকলেও মূলত ঈদের পর দিন থেকে হোটেল-রিসোর্ট বুকিং হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বুকিং হয়নি এবার। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৪০-৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবু পর্যটক তেমন আসেননি। এ বছর দেশব্যাপী শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকদের আগমন খুব কম। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াও একটি কারণ। এ ছাড়া ঢাকা সিলেট মহাসড়কের বেহাল দশা ও জেলার পর্যটন এলাকার সংযোগ সড়কের অবস্থা খারাপ থাকায় পর্যটকদের আগমন বেশ কয়েক মাস ধরে কম দেখা যাচ্ছে। তারপরও ৭০ শতাংশ হোটেল কক্ষ বুকিং হয়েছে।’

রাধানগর নিসর্গ নিরব ইকো-কটেজের মালিক কাজী শামছুল হক বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায়। ঈদের দিন পর্যন্ত অমুসলিম পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল। ঈদের পরদিন থেকে মুসলিম পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে। জেলায় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই শ্রীমঙ্গলে। বর্তমানে আরও হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ হচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতাও বেড়ে গেছে।’

পর্যটক কম আসার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সড়কে যানজট থাকায় অনেকে পর্যটক আসতে চায় না। আবার অনেকে ট্রেনে আসতে চাইলে টিকিট সংকট। পর্যটকরা টিকিট পান না। ফলে অনেকে আসতে চাচ্ছেন না। যদি পর্যটকদের জন্য ঢাকা-সিলেট রেলপথে একটি ট্রেন যুক্ত করা হয় তখন পর্যটক বাড়বে।’

রাধানগর পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রির্সোট অ্যান্ড গলফের মহাব্যবস্থাপক আরমান খান বলেন, ‘এবার ঈদুল আজহার ছুটিতে হোটেল-রিসোর্টগুলো ভাড়ার ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েছে। তবু প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যটক আসেনি। তবে গত ঈদুল ফিতরে পর্যটক আশানুরুপ ছিল।’

বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা

সিনিয়র ট্যুর গাইড সৈয়দ রিফাত জামান বলেন, ‘বিদেশি পর্যটক আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে যারা আসছেন তারা ভিআইপি বা উচ্চ আয়ের ট্যুরিস্ট। তবে স্বল্প আয়ের বিদেশি ট্যুরিস্টের আগমন আগের চেয়ে কমেছে। স্বল্প আয়ের বিদেশি ট্যুরিস্টদের আগে রাস্তায় বাইসাইকেল বা হেঁটে ঘুরতে দেখা যেতো। থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় তাদের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক দেশি পর্যটক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসেন, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান তারা ঘুরেন। খরচ সংকোচন করতে রাত্রিযাপন না করে আবার অনেকে চলে যান।’

লাউয়াছড়ায় দর্শনার্থী ও রাজস্ব

লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘ঈদের তৃতীয় দিন লাউয়াছড়ায় ১৭ জন বিদেশি পর্যটকসহ মোট দুই হাজার ৬৩৬ জন দর্শনার্থী জাতীয় উদ্যানে টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা।’

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মৌলভীবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. কামরুল চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের সমন্বয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঈদে যানজট নিরসনে পর্যটন পুলিশ কাজ করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কোনও ধরনের ঘাটতি নেই।’