বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বাংলাদেশে প্রভাব সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সারা বিশ্বেই জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে এই দাম বৃদ্ধির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব তেমন গুরুতর হবে না বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, যদি কোনো প্রভাব পড়েও থাকে, তাহলে সরকার প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর যেন তা না পড়ে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, বাজারে কোনো ধরনের অবৈধ যোগসাজশ বা সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি দেশের মানুষকে জিম্মি করতে পারবে না।
টাস্কফোর্সের একাদশ বৈঠকে মূল আলোচনা
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি বিষয়ক টাস্কফোর্সের একাদশ বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী এই ব্রিফিং করেন। বৈঠকে বাণিজ্যসচিবের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান সূচনা বক্তব্য দেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, টাস্কফোর্সের দশম বৈঠকটি গত ২৫ জানুয়ারি সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যার মধ্যে ছয়টি ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আজকের বৈঠকে জানানো হয়, শুধুমাত্র গরম মসলার ওপর আরোপিত শুল্ক হার পুনর্বিবেচনার বিষয়টি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করেছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
জ্বালানি দাম বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন, বাংলাদেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এই দাম দুই ডলার ৮০ সেন্ট থেকে বেড়ে ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে।
তিনি একটি উদাহরণ দেন, "চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী একটি ট্রাক আসতে যে পরিমাণ ডিজেল লাগে, আমরা হিসাব করে দেখেছি যে এতে মাত্র ৪৫০ টাকা বাড়তি গুনতে হবে।" এই তথ্যটি বাংলাদেশে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সীমিত রাখার দিকটি স্পষ্ট করে।
মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা ৮ শতাংশের বেশি রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতির প্রধান দুটি কারণ হলো চাহিদা ও ব্যয়জনিত বিষয়। তবে নিত্যপণ্যের মজুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রেখেছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ৭০ লাখের বেশি উপকারভোগী নিয়মিত সহায়তা পাচ্ছেন। প্রতি মাসের পাশাপাশি দুই ঈদে ট্রাক সেলের মাধ্যমে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেও নিম্ন আয়ের মানুষরা উপকৃত হচ্ছেন।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সরকারের নজরদারি
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার এই বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সচেষ্ট রয়েছে।
বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলেও খোলা সয়াবিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ বাজারে আছে বলে তিনি দাবি করেন। নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার বিষয়টিও সরকার নজরে রেখেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ঈদুল আজহার প্রস্তুতি ও সুপারিশ
সামনে ঈদুল আজহা উপলক্ষে নিত্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- মসলা আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা
- পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক মুনাফা করতে না দেওয়া
- অবৈধ মজুতদারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ
- লবণের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখা
- ঋণপত্র (এলসি) খোলা পণ্যের আমদানি ঈদের আগেই নিশ্চিত করা
বাণিজ্যমন্ত্রী শেষে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, "সরকার বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি বরদাশত করবে না। এটি ১৮ কোটি মানুষের দেশ। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বাজারকে জিম্মি করতে পারবে না।"



