কোরবানির চামড়ার দরপতন: সম্ভাবনাময় শিল্পের সংকট
কোরবানির চামড়ার দরপতন: সম্ভাবনাময় শিল্পের সংকট

বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ চামড়া ফেলে দেওয়া, মাটিতে পুঁতে ফেলার যে চিত্র দেখা গেল, সেটা হতাশাজনক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার গতবারের তুলনায় কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়েছিল। অথচ বাস্তবে দেখা গেল প্রতি পিস চামড়া গতবারের তুলনায় ১৫০–২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে।

চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য পুরোটাই দেশীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্প হওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি আয়ের দিক থেকে এ খাতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আশির দশকেও রপ্তানি আয়ের বিবেচনায় তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে এগিয়ে ছিল চামড়াশিল্প। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিগত সরকারগুলোর নীতিগত ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশে প্রতিবছর যেখানে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের উদ্যোক্তাদের বেশি দামে বাইরে থেকে চামড়া আমদানি করে আনতে হচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এ বছর অপেক্ষাকৃত কম পশু কোরবানি হবে, ধরে নিয়েই সরকার এবার ৭৫–৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চামড়া কিনতে ট্যানারিমালিকদের রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক ১৬০ কোটি টাকা ঋণও দিয়েছে। এরপরও কাঁচা চামড়ার বাজারে দরপতন ঠেকানো যায়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনীতিতে চামড়ার গুরুত্ব

কোরবানির পশুর চামড়া অর্থনীতিতে যে মূল্য সংযোজন করে, তার ওপর মৌসুমি ব্যবসায়ীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন–জীবিকা নির্ভরশীল। দেশের অনেক মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের সারা বছরের ব্যয়ের একটি অংশ আসে চামড়া বিক্রি করে। চামড়ার বাজার পড়ে গেলে এই জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রপ্তানি আয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ

দুঃখজনক হলেও সত্যি, কোরবানির ঈদের আগে–পরের কয়েকটা দিনই চামড়া ও চামড়াশিল্প নিয়ে আলোচনা চলে। বিশ্বে চামড়ার যেখানে ৩০০-৪০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে, সেখানে আমরা এ খাতে রপ্তানি আয় ১ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছি। এর কারণ হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা চামড়া বা চামড়াজাত পণ্যের বাজার তৈরি করতে পারিনি। আমরা মনে করি, এখানে সরকারের দায় আছে একইভাবে উদ্যোক্তা, ট্যানারিমালিক, চামড়া প্রস্তুতকারক, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারীদেরও দায় রয়েছে।

সমাধানের পথ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের উৎসকে বহুমুখী করার যে জরুরি কর্তব্য সরকারের সামনে এসেছে, তা বাস্তবায়নে চামড়াশিল্প একটি ঘুরে দাঁড়ানো খাত হয়ে উঠতে পারে। কেননা এ শিল্পের কাঁচামালের প্রায় সবটাই দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। অপার সম্ভাবনার এ খাতটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও আরও বড় অবদান রাখতে পারে। আমরা মনে করি, চামড়া ও চামড়াশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সে ক্ষেত্রে চামড়াশিল্পকে শুধু কোরবানির মৌসুমকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক সনদ

যে পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ খোলার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১৭ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের বিসিক চামড়াশিল্প নগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে হয়েছিল, সেটা এখনো পূরণ হয়নি। ৯ বছর পরও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এর ফলে ট্যানারিগুলো এলডব্লিউজির আন্তর্জাতিক সনদ পাচ্ছে না। এটি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বড় বাজারগুলোয় আমাদের চামড়াজাত পণ্যের প্রবেশ সম্ভব নয়।

সুপারিশ

সময় এসেছে আমাদের ট্যানারিশিল্পকে নতুন করে গড়ে তোলার। আমাদের অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানিমুখী বাজারের জন্য আলাদা ট্যানারি ও শিল্পকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।