কমলাপুর পশুরহাটে দাম ধস, ক্রেতা নেই, খামারিরা হতাশ
কমলাপুর পশুরহাটে দাম ধস, ক্রেতা নেই, খামারিরা হতাশ

রাজধানীর কমলাপুর পশুরহাটে যেন হঠাৎ করেই উল্টে গেছে কোরবানির বাজারের পুরো হিসাব। যে গরুর দাম মঙ্গলবারও দুই লাখ টাকা বলা হয়েছিল, আজ সেই গরুর দাম নেমে এসেছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও তিন লাখ টাকার গরুর দাম বলা হচ্ছে মাত্র এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। ক্রেতা নেই, বিক্রি নেই— অথচ হাটজুড়ে শত শত গরু। ফলে চরম হতাশা, লোকসান আর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শত শত খামারি ও ব্যবসায়ী।

হাটজুড়ে শুধু গরু আর বিক্রেতা

বুধবার (২৭ মে) রাত ১০টা পর্যন্ত কমলাপুর পশুরহাট ঘুরে দেখা যায়, হাটজুড়ে শুধু গরু আর বিক্রেতা। কিন্তু নেই প্রত্যাশিত ক্রেতা। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে হাটে মানুষের ভিড় ছিল উপচে পড়া, সেখানে সন্ধ্যার পর থেকেই নেমে আসে অদ্ভুত নীরবতা। বিক্রেতাদের অনেকে গরুর পাশে বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। কেউ হিসাব মেলাচ্ছেন লোকসানের, কেউ আবার ট্রাক ভাড়া করে গরু ফেরত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামের দিশেহারা অবস্থা

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ৮০টি গরু নিয়ে কমলাপুর হাটে এসেছেন ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম। তার বেশিরভাগ গরুর দাম ছিল দুই লাখ টাকার ওপরে। কিন্তু শেষ সময়ে এসে তিনি যেন পুরোপুরি দিশেহারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শহিদুল ইসলাম বলেন, “যে গরুর কেনা দামই দুই লাখ টাকা, সেই গরু এখন মানুষ দাম বলছে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। এই দামে বিক্রি করলে প্রতিটি গরুতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। এত কম দামে বিক্রি করার চেয়ে গরু ফিরিয়ে নেওয়াই ভালো।”

তিনি জানান, রাত ১২টার দিকে ট্রাক আসবে। এরপর অবিক্রিত গরুগুলো আবার গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তার ভাষায়, “গরুগুলো ট্রাকে করে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে এসেছে। তারপর আবার বৃষ্টির মধ্যে হাটে থাকতে হয়েছে। অনেক গরু অসুস্থ হয়ে গেছে, কয়েকটার জ্বরও এসেছে। এখন এগুলো গ্রামে নিয়ে গিয়ে অন্তত ১০ দিন পরিচর্যা করতে হবে। তারপর হয়তো কেজি দরে বিক্রি করতে হবে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য ব্যবসায়ীদেরও একই অবস্থা

শুধু শহিদুল ইসলাম নন, একই চিত্র পুরো হাটজুড়েই। ঝিনাইদহ থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী জানান, তার ১০টি গরুই অবিক্রিত রয়েছে। প্রতিটি গরুতে অন্তত ২০ হাজার টাকা করে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

তিনি বলেন, “গতকাল যে গরু দুই লাখ টাকা দাম বলেছে, আজকে সেই গরুর দাম এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। মানুষ দাম শুনে চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিক্রি করার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছি।”

বড় গরুর বাজারে ধস

হাট ঘুরে দেখা যায়, ছোট, মাঝারি ও বড়— সব ধরনের গরুই অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বড় গরুর বাজারে ধস নেমেছে সবচেয়ে বেশি। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, শেষ মুহূর্তে বৃষ্টির কারণে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। যারা এসেছেন, তারাও কম দামে গরু কিনতে চাইছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মঙ্গলবার যে গরু তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আজ একই ধরনের গরুর দাম বলা হচ্ছে এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন বিক্রেতারা।

অবিক্রিত পশু আর ক্লান্ত ব্যবসায়ী

একসময় গমগম করা হাটে এখন দেখা যাচ্ছে শুধুই অবিক্রিত পশু আর ক্লান্ত ব্যবসায়ী। কোথাও কোথাও বিক্রেতাদের কাঁদতেও দেখা গেছে। অন্তত ২০ জন ব্যবসায়ীকে চোখ মুছতে দেখা যায়। বছরের সঞ্চয়, ধারদেনা আর ব্যাংক ঋণ নিয়ে গরু কিনে এনে এখন তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিক্রেতাদের অভিযোগ

বিক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণা ও অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেককে বিপদে ফেলেছে। গত কয়েক দিনে গরুর দাম বাড়বে— এমন আশায় অনেকে উচ্চ দামে গরু কিনেছিলেন। কিন্তু শেষ সময়ে এসে ক্রেতা সংকট ও আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে সেই হিসাব পুরোপুরি উল্টে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতামত

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছর কোরবানির বাজারে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে বড় গরুর ক্রেতা কমে গেছে। পাশাপাশি টানা বৃষ্টির কারণে শেষ সময়ের বেচাকেনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফিরতি ট্রাকের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা

হাটে থাকা ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন ফিরতি ট্রাকের অপেক্ষায়। কেউ গরু ফেরত নিচ্ছেন খামারে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে কম দামে বিক্রি করে অন্তত কিছু টাকা উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। কমলাপুর পশুরহাটের একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, “এমন খারাপ পরিস্থিতি অনেক বছরেও দেখা যায়নি। গরু আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। শেষ পর্যন্ত আমাদের কান্না ছাড়া আর কিছুই থাকছে না।”