ঝুঁকি জেনেও খোলা ট্রাকে ঈদযাত্রা, থামছে না প্রাণহানি
ঝুঁকি জেনেও খোলা ট্রাকে ঈদযাত্রা, থামছে না প্রাণহানি

বৃষ্টিতে ভিজে খোলা পিকআপের পাটাতনে গাদাগাদি করে বসে আছেন কয়েকজন পোশাকশ্রমিক। কারও কোলে ছোট শিশু, কারও হাতে ঈদের বাজারের ব্যাগ। গাজীপুরের কারখানা ছুটি হতেই তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন মহাসড়কে। কিন্তু একদিকে গাড়ির সংকট, অন্যদিকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি জেনেও তারা উঠেছেন পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপে।

ঈদযাত্রায় খোলা যানবাহনের চিত্র

ঈদুল আজহা ঘিরে এমন দৃশ্য যাচ্ছে এখন দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে। স্বল্প আয়ের হাজারো মানুষ সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে কিংবা কোনোভাবে বাড়ি পৌঁছাতে ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য খোলা যানবাহনকেই বেছে নিচ্ছেন। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেই টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে প্রাণ গেছে ১৭ জনের। তারপরও থামেনি এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। অনেকের কাছে মৃত্যুঝুঁকির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বাড়ি ফেরার তাগিদ ও বাড়তি ভাড়ার চাপ।

কালিহাতী দুর্ঘটনার পরও অব্যাহত ঝুঁকি

সোমবার (২৫ মে) টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৭ জন নিহত হন। তারা চুল ও ভাঙা মোবাইল ফোন সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাদের মতো আরও অনেকেই এবার ঈদযাত্রায় ট্রাক-পিকআপসহ খোলা যানবাহনে বাড়ি ফিরছেন। ওই দুর্ঘটনার পর জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, মহাসড়কে এভাবে খোলা যানবাহনে যাতায়াত কীভাবে চলছে? পুলিশ কেন তা বন্ধ করতে পারছে না?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ বলছে, খোলা যানবাহনে ভ্রমণ না করার বিষয়ে নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে অনেকেই তা মানছেন না। এছাড়া ঈদযাত্রায় যাত্রীর তুলনায় যানবাহনের সংকটও থাকে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের হওয়ায় মানবিক বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য, ট্রাক-পিকআপে যাত্রাকারীরা সাধারণত নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড বা টার্মিনালে যান না। তারা কারখানার সামনে বা বাজার এলাকায় দাঁড়িয়ে যানবাহন থামিয়ে চালকের সঙ্গে ভাড়া ঠিক করে যাত্রা শুরু করেন। ফলে কার্যকর নজরদারি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাত্রীদের দুর্ভোগ

এদিকে, কালিহাতীর দুর্ঘটনার পরও মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন সড়কে ট্রাক-পিকআপে করে মানুষকে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। বৃষ্টির কারণে এসব যাত্রীর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। তাদের বেশিরভাগই পোশাকশ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষ। যাত্রীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পরিবহন না পাওয়া এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে তারা বাধ্য হয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পরিবহন বেছে নিচ্ছেন। ঈদ এলেই ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গাজীপুর থেকে বগুড়ার বাসভাড়া যেখানে সাধারণ সময়ে প্রায় ৫০০ টাকা, সেখানে এখন চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। একই পথে ট্রাকে যাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, আর পিকআপে খরচ আরও কম।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, বাস মালিকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাতায়াত করছেন। এর ফলেই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।

সোমবার (২৫ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া বহন করতে না পেরে নিম্নআয়ের মানুষ খোলা ট্রাক, পণ্যবাহী যান কিংবা ট্রেনের ছাদে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে রডবোঝাই ট্রাক দুর্ঘটনা তারই মর্মান্তিক উদাহরণ, যেখানে অন্তত ১৭ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন।

একইভাবে নরসিংদীর ঘোড়াশালে ট্রেনের ছাদে বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঈদযাত্রার অনিরাপদ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে লাখো শ্রমজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বল্প খরচে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন। অথচ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

সংগঠনটি অবিলম্বে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বাস মালিকদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং যাত্রীদের ট্রাক, ট্রেনের ছাদ বা ফিটনেসবিহীন যানবাহনে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের অবস্থান

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ট্রাক-পিকআপসহ খোলা যানবাহনে ভ্রমণ না করার বিষয়ে পুলিশের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই তা মানছেন না এবং ঝুঁকি নিয়েই যাত্রা করছেন। তিনি বলেন, মহাসড়কে চোখে পড়লে এসব যানবাহন থামিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে যাত্রীদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের মানুষ হওয়ায় ঈদের সময়ে মানবিক দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হয়।