নিত্যপণ্যে উৎসে কর দ্বিগুণের প্রস্তাব এনবিআরের
নিত্যপণ্যে উৎসে কর দ্বিগুণের প্রস্তাব এনবিআরের

রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর বাড়ানোর পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী— চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ফল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ অন্তত ২৮টি কৃষি ও খাদ্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহের ওপর উৎসে করের হার বর্তমান ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান-সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে প্রস্তাবটি আগামী জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

যেসব পণ্যে বাড়তে পারে উৎসে কর

এনবিআরের প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে— ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা, খেজুর এবং সব ধরনের ফল। এছাড়া ধানের কুড়া, বীজ, সরিষা, তিল, কাঁচা চা-পাতা, পাটকাঠি ও পাটজাত পণ্যও উৎসে কর বৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজস্ব বাড়ানোর চাপ

এনবিআর সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আরও বড় হতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি কমে যাওয়া এবং করজাল সীমিত থাকার কারণে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়িয়েই রাজস্ব ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে সংস্থাটি। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে সঠিকভাবে কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে শুধু এই খাত থেকেই বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, রাজস্ব বাড়ানোর এই কৌশল শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

কী এই উৎসে কর?

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনও করপোরেট প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য কিনলে বিল পরিশোধের সময় নির্ধারিত হারে কর কেটে রাখে। পরে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। আর এলসির মাধ্যমে আমদানি হলে ব্যাংক সরাসরি ওই কর কেটে এনবিআরে জমা দেয়। খাদ্য ও পানীয় খাতের বড় কোম্পানি, ওষুধ শিল্প, সুপারশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বৃহৎ করপোরেট ক্রেতারা এই ব্যবস্থার আওতায় পড়ে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমডি নাম প্রকাশ না করে বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ টন চাল কেনা হয়। আমরা কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরবরাহকারীদের বিল দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখা হয়। বাজেটে হার বাড়লে সেই অনুযায়ী কর্তনও বাড়বে।”

মূল্যস্ফীতির নতুন শঙ্কা

ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উৎসে কর বাড়ানো হলে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে বাজারদরের ওপরে। কারণ ব্যবসায়ীরা এই অতিরিক্ত করকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, “এনবিআরের কাছে একবার টাকা গেলে বাস্তবে সেটা ফেরত পাওয়া খুব কঠিন। ফলে ব্যবসায়ীরা করকে খরচ হিসাবেই ধরে নেয়। এতে পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে।” তার মতে, বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও ১০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যে কর বাড়ানো হলে বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

নীতিতে বড় ধরনের উল্টোযাত্রা?

মজার বিষয় হলো, বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানই কয়েক বছর আগে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যকে উৎসে করের আওতার বাইরে রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি থাকাকালে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, “মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় সব ধরনের কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যকে উৎসে কর কর্তনের বাইরে রাখা উচিত।” কিন্তু এখন রাজস্ব ঘাটতির চাপে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে উল্টো কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এনবিআরের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েক দফায় এই কর কমানো হয়েছিল। এখন আবার বাড়ানো হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।”

গত কয়েক বছরে যেভাবে বদলেছে করহার

নিত্যপণ্যের উৎসে করের হার গত কয়েক বছরে একাধিকবার পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্থানীয় সরবরাহ ও এলসি-বিহীন লেনদেনে উৎসে কর বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হয়, পরে তা কমিয়ে ১ শতাংশে আনা হয়। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে করহার আরও কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে। এখন আবার সেই হার দ্বিগুণ করার চিন্তা করছে এনবিআর।

শুধু নিত্যপণ্য নয়, আরও যেসব খাতে বাড়তে পারে কর

বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুধু নিত্যপণ্যে উৎসে কর নয়, আরও কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত বিবেচনায় রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে রয়েছে— রফতানি প্রণোদনার উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা, উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুনভাবে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালু, ব্যাংকে চলতি হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা, পাস্তা, ফলের রস, আইসক্রিম, কোমল পানীয়, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর আরোপ, অতি ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপের চিন্তা। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের শর্ত পূরণে কিছু আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানো হলেও ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের ওপর নতুন করে কর আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ই-সিগারেট নিয়ে বিতর্ক

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচকে ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মতো কর কাঠামোর আওতায় আনা হতে পারে। যদিও চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই-সিগারেট আমদানি ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছিল। তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, কর আরোপের মাধ্যমে এই পণ্যের এক ধরনের পরোক্ষ বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, “ফ্লেভারভিত্তিক ই-সিগারেট তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। সরকার যদি একে পুরোপুরি বন্ধ না করে, তাহলে অন্তত উচ্চহারে কর আরোপ করা উচিত।”

সামনে বড় প্রশ্ন— রাজস্ব, নাকি মূল্যস্ফীতি?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু নিত্যপণ্যে উৎসে কর বাড়ানো হলে এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী অবস্থায় চলে যেতে পারে। কারণ, সরবরাহ পর্যায়ে কর বাড়ানো মানে শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি যখন এখনও উচ্চ পর্যায়ে, তখন নতুন করের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আসন্ন বাজেটে সরকার শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেয়— রাজস্ব আহরণ নাকি ভোক্তা স্বস্তি, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।