দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য কিনতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দীর্ঘ লাইন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হার। চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল, তবে রমজান মাসে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এটিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ও ভবিষ্যত আশঙ্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকারের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ
দেশে তিন বছরের বেশি সময় ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ভারত, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে এটি ৮ শতাংশের নিচে নামেনি।
নীতি সুদহার বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যে করহার কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামাতে না পারার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। সমস্যাটিকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়নি এবং সময়মতো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নীতিগত ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা গেছে। এ ছাড়া বাজার তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়া এবং চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের প্রভাবেও পণ্যমূল্য কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো সম্ভব হয়নি।
মূল্যস্ফীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির ভাষায় নীরব ঘাতক বলা হয়, কারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি না বাড়লে প্রকৃত আয় কমে যায়। ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, মধ্যবিত্তদের জীবনযাপনেও সংকট তৈরি করে। শিক্ষা, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় খাতে খরচ কাটছাঁট করে জীবনযাপন করতে হয়। দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ার পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতিফলন স্পষ্ট।
সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও সমাধান
বিএনপি সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মতো অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, খাদ্যপণ্যের বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে নতুন মূল্যস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়ার আগেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় ও সঞ্চয়ের নীতি নিয়েছে।
দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সম্ভাব্য সব বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ ও খাদ্যপণ্য আমদানির উপায় খুঁজতে হবে। কোভিড মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের জীবনযাপনের চাপ কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিএনপি সরকার আজ থেকে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প পাইলট আকারে শুরু করছে। এর বাইরে শহরাঞ্চলে ট্রাকে করে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি বাড়ানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
