উত্তরায় টিসিবি ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি, পড়ে গেলেন দুই নারী, মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষের সংগ্রাম
উত্তরায় টিসিবি ট্রাকে হুড়োহুড়ি, পড়ে গেলেন নারী, মূল্যস্ফীতির চাপ

উত্তরায় টিসিবি ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি, পড়ে গেলেন দুই নারী

রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড় এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে টিসিবির একটি ট্রাক সেল কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ট্রাকের পেছনে পণ্য কিনতে দাঁড়ানো নিয়ে দুই দফায় হুড়োহুড়ি শুরু হলে ট্রাকটি দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় কয়েকজন নারী-পুরুষ ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়েন এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুই নারী সড়কে পড়ে যান। পরে টিসিবির পরিবেশক রেজাউল করিম প্রথম আলোকে জানান, ট্রাকে যত লোকের জন্য পণ্য আনা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ লাইনে দাঁড়ান, ফলে প্রতিদিনই এমন হুড়োহুড়ির ঘটনা ঘটে।

রমজানে ট্রাক সেল ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংগ্রাম

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত ২০ দিন ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি (ট্রাক সেল) চালু করেছে টিসিবি। ট্রাকের পেছনে রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে নির্ধারিত পরিমাণে সব পণ্য পেলে একজন মানুষের সাশ্রয় হয় প্রায় ৩৫০ টাকা। এই টাকা বাঁচাতে নিম্ন আয়ের মানুষকে রীতিমতো লড়াই করতে হয়, বিশেষ করে নারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। উত্তরার খালপাড় এলাকায় সেই দৃশ্যই ধরা পড়েছে প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক দীপু মালাকারের ক্যামেরায়। তাঁর তোলা ছবি দুপুরে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয় এবং রাত ৯টা পর্যন্ত ১ লাখ ৩৮ হাজার ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানান, ৮ হাজার ২০০ জন মন্তব্য করেন।

ফটোসাংবাদিক দীপু মালাকার বলেন, ঘটনার পর ট্রাকটি সেখান থেকে চলে যায় এবং অন্য কোথাও পণ্য বিক্রি করে, যাঁরা অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা পণ্য পাননি। পড়ে যাওয়া নারীকেও তিনি আর খুঁজে পাননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সংসার চালানোর কষ্টটা যে আমাদের মা-বোনদের বেশি, সেটা ছবি তোলার পর বুঝতে পারি।’

মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চড়া হার

২০২০ সালে করোনা মহামারির পর থেকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছিল, যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মাত্রা ছাড়ায়। ডলার, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা শ্রমজীবী মানুষের আয় বাড়ানো ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ কিছু করেনি।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং ২০২৫ সালে তা ২১ শতাংশের বেশি হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপে দারিদ্র্য হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, এবং ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ১৮ মাসে তা ৮ শতাংশের নিচে নামেনি। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যার অর্থ আগে ১০০ টাকায় কেনা পণ্য এখন ১০৮ টাকায় কিনতে হয়।

টিসিবির ট্রাক সেল ও সাশ্রয়ের হিসাব

টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসে মাসে নিম্ন আয়ের মানুষকে তেল, চিনি ও ডাল ভর্তুকি মূল্যে দেয়। আওয়ামী লীগ আমলে ফ্যামিলি কার্ড চালু হয়েছিল, কিন্তু স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার পর্যালোচনা করে কার্ডসংখ্যা কমিয়ে ৬৬ লাখে নিয়ে আসে। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি ট্রাক সেলও চালু রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।

টিসিবি জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০টি জায়গায় ট্রাক সেল করা হয়। গতকাল উত্তরা ছাড়াও খামারবাড়ি ও কারওয়ান বাজার এলাকায় ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। খামারবাড়িতে টিঅ্যান্ডটি মাঠসংলগ্ন সড়কে বেলা পৌনে তিনটার দিকে শতাধিক নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। ট্রাকে ৭৪ জনের পণ্য ছিল, কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি।

টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল (প্রতি লিটার ১১৫ টাকা), দুই কেজি মসুর ডাল (৭০ টাকা), এক কেজি চিনি (৮০ টাকা), এক কেজি ছোলা (৬০ টাকা) ও আধা কেজি খেজুর (৮০ টাকা) কিনতে পারেন। সব মিলিয়ে ৫৯০ টাকায় এই পণ্য কেনা যায়, যেখানে বাজার থেকে সমপরিমাণ পণ্যের দাম প্রায় ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩৫০ টাকা সাশ্রয় হয়।

সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। ২০ দিনে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকে, কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা তার দেড় থেকে দুই গুণ বা তারও বেশি।

নতুন সরকারের প্রত্যাশা

বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে মাসে মাসে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য দেওয়া হবে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে নামিয়ে আনতে আগের সরকার সফল হয়নি, কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে এর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। নতুন সরকারের কাছে মানুষের বড় প্রত্যাশা আছে যে তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বাস্তবতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনা জরুরি।