রাজশাহীর ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত পানের উৎপাদন এ মৌসুমে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষকরা চাষাবাদ সম্প্রসারণ করেছেন এবং অনুকূল আবহাওয়ার সুবিধা পেয়েছেন। তবে, বাম্পার ফলনের ফলে স্থানীয় বাজারে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা দাম কমিয়ে দিয়েছে এবং কৃষকদের মুনাফা হ্রাস করেছে।
পান চাষের বিস্তার ও উৎপাদন
পান চাষ রাজশাহীর হাজার হাজার কৃষক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস, বিশেষ করে মোহনপুর, বাগমারা ও দুর্গাপুর উপজেলায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চাষের জমির পরিমাণ ৫১০ হেক্টর বেড়েছে এবং উৎপাদন ৮৭ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত মৌসুমে ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমি থেকে ৭৭ হাজার ৪৫২ মেট্রিক টন পান উৎপাদিত হয়েছিল।
বাজারে দামের চিত্র
মোহনপুরের মৌগাছি, কেশরহাট, পাকুরিয়া, কুঠিবাড়ি ও একডিলতলা পানের বড় হাটগুলোতে বেচাকেনা জমজমাট। কৃষকরা সাইকেল, ভ্যান ও পায়ে হেঁটে সদ্য তোলা পান নিয়ে আসছেন। প্রচুর সরবরাহের কারণে দাম দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে উত্তম মানের পান প্রতি পোয়া ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, বড় জাতের পান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মাঝারি মানের পান ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ছোট পান ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, এক বিরায় ৬৪টি পান থাকে এবং ৩২ বিড়ায় এক পোয়া হয়, অর্থাৎ ২ হাজার ৪৮টি পান।
কৃষকদের হতাশা
উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। মোহনপুরের হরিদাগাছি গ্রামের চাষী বদরুদ্দিন বলেন, “আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। ১০ বান্ডিল বড় পান ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেছি। উৎপাদন বেশি, কিন্তু দাম কমায় লাভ কমছে।” আরেক কৃষক গোলাম মোস্তফা বলেন, সার, কীটনাশক, শ্রম ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়েছে, যা ভালো ফলন সত্ত্বেও আয় কমিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও পাইকারি ক্রেতা বাজারে এলে এবং দাম বাড়লে কৃষকরা লাভবান হবেন বলে মন্তব্য করেন।
সংরক্ষণ ও বিপণনের চ্যালেঞ্জ
কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, পানের শেলফ লাইফ কম থাকায় বেশিরভাগ চাষী দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন, প্রায়শই কম দামে। তিনি বলেন, উন্নত সংরক্ষণ ও বিপণন সুবিধা থাকলে কৃষকরা ভালো দাম পেতে পারেন।
সরকারি পরামর্শ ও সহায়তা
কৃষি কর্মকর্তারা উৎপাদন বৃদ্ধিকে উৎসাহজনক বললেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে বাজার সম্প্রসারণ না হলে দাম চাপে থাকবে। তারা সংরক্ষণ, পরিবহন, পাইকারি বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রাজশাহীর বাইরে বিতরণের উন্নতির ওপর জোর দিয়েছেন। কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজশাহীর জিআি-ট্যাগযুক্ত পানের শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ও প্রচার এর সুনাম বাড়াতে, বাজার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে এবং কৃষকের আয় উন্নত করতে পারে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, কৃষকরা মানসম্পন্ন উৎপাদন, রোগ ও পোকা ব্যবস্থাপনা এবং বাজারমুখী চাষাবাদে কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
মোহনপুরে পানের অর্থনীতি
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, পান এই অঞ্চলের প্রধান কৃষি পণ্য। মোহনপুরে এ বছর প্রায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে, যার বার্ষিক বাণিজ্যের মূল্য আনুমানিক ৬৫০ কোটি টাকা। মৌগাছি, জাহানাবাদ ও ধুরইল ইউনিয়ন এই অঞ্চলের প্রধান পান উৎপাদন এলাকা।



