গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার যুগিবাড়ি গ্রামের কৃষক জুয়েল মিয়া (২৫) আঙুর চাষে সফলতা অর্জন করেছেন। তিনি বর্তমানে ২৫ শতক জমিতে ৩৬ জাতের বিদেশি আঙুর চাষ করছেন। আঙুর ও চারা বিক্রি করে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
শিক্ষা ও উদ্যোগ
জুয়েল মিয়া ২০১৪ সালে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে পলাশবাড়ী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) পাস করেন। চাকরির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে কিছুদিন বেকার থাকেন। পরে ইউটিউব দেখে বিদেশি আঙুর উৎপাদনের কৌশল শেখেন। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রথমে বাবার পাঁচ শতক জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেন।
আঙুর বাগানের বর্তমান অবস্থা
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুরের ইদিলপুর ইউনিয়নের যুগিবাড়ি গ্রামে অবস্থিত ‘জুয়েল নার্সারি’। বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়কের পাশে সাইনবোর্ড ঝুলছে। ভেতরে গাছে থোকা থোকা আঙুর ঝুলছে, পাখি ও পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষায় ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। জুয়েল মিয়া আঙুরগাছের পরিচর্যা করছেন। বাগানে লোক আসছে, তাঁদের আঙুর খাওয়াচ্ছেন। মিষ্টি আঙুর দেখে অনেকে কিনছেন, কেউ আবার চারাগাছ নিতে আসছেন। চারাগাছের দাম আকার অনুযায়ী ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
যুগিবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও গাইবান্ধা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী বায়েজিদ মিয়া বলেন, ‘জুয়েল চাচার বাগানে একসঙ্গে অনেক জাতের আঙুর আছে। খেয়েছি, বেশ সুস্বাদু।’
চাষের পদ্ধতি ও উন্নতি
উদ্যোক্তা জুয়েল মিয়া বলেন, ‘২০২২ সালের শেষ দিকে প্রথমে পাঁচ শতক জমিতে আঙুরগাছ লাগাই। পরের বছর ফল আসে, কিন্তু সেগুলো কম মিষ্টি ছিল, কিছুটা টক। পরে মিষ্টি জাতের আঙুর দেশে আছে কি না জানতে ইউটিউবে খুঁজতে শুরু করি। ইউটিউব দেখে আঙুর চাষের কৌশল ও পরিচর্যা করা শিখি। ২০২৩ সালে কুড়িগ্রাম জেলার এক চাষির কাছ থেকে মাত্র পাঁচটি আঙুরের চারা সংগ্রহ করি। ফল হলে খেয়ে দেখি, সেগুলো মিষ্টি। এরপর ওই সব গাছে কলম দিতে থাকি। এভাবে আঙুরগাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন বাবার ২৫ শতক জমিতে প্রায় ১১০টি গাছে ৩৬ জাতের আঙুর রয়েছে। বর্তমানে বাইকুনুর, জয় সিডলেস, গ্রিন লং, ক্রিমসন সিডলেস, রেড গ্লোবসহ ৩৬ জাতের বিদেশি আঙুর চাষ করছি। পাশাপাশি আঙুরের চারাও উৎপাদন করছি।’
পরিবার ও আর্থিক অবস্থা
জুয়েলের ছোট দুই বোন লিমা আক্তার (১৯) ও লিকসা আক্তার (১৬) লেখাপড়া করছে। ২০২৪ সালে জুয়েল বিয়ে করেন। মা জুলেখা বেগম, বাবা আনছার আলী ও স্ত্রী মাহফুজা খাতুনকে নিয়ে তাঁর ছয় সদস্যের পরিবার। কৃষিকাজ করেই তাঁর সংসার চলে। জুয়েলের স্ত্রী মাহফুজা খাতুন বলেন, ‘আঙুর চাষে তাকে উৎসাহ দিই, সহযোগিতাও করি।’
জুয়েল মিয়া জানান, আঙুর ও চারা বিক্রি করে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ২৫ শতক জমিতে আঙুর চাষে তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি আঙুর ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আঙুর চাষে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে জুয়েল মিয়া বলেন, ‘যখন আঙুর পাকা শুরু করে, তখন অতিমাত্রায় বৃষ্টি হলে ফলে পচন ধরে। এবার অনেক ফল নষ্ট হয়েছে। বিদেশে বাগানগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ইউটিউবের ভিডিওতে দেখা যায়, বিদেশে পলি, নেট ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশে এভাবে করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। এমনকি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে।’
ইদিলপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লিটন মিয়া বলেন, উদ্যোক্তা জুয়েল মিয়া আঙুর চাষে সফল হয়েছেন। তাঁর বাগানে ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



