পাবনায় পেঁয়াজের দামে ধস: কৃষকেরা লোকসানের মুখে
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার করমজা চতুরহাটে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দামে ধস নেমেছে। গত মঙ্গলবার প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়, কিন্তু মাত্র চার দিনের ব্যবধানে আজ শনিবার সেই দাম নেমে এসেছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। হঠাৎ এভাবে দাম অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষকেরা ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
দামের ওঠানামা ও কৃষকদের দুর্ভোগ
উপজেলা কৃষি কার্যালয় ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসে প্রায় দুই মাস আগে। তখন প্রথম দিকে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায়। পরে দাম কমে একপর্যায়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। এরপর আবার বাড়তে বাড়তে তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় পৌঁছায়। এই দামে কৃষকেরা প্রতি মণে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভ করছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার থেকে দ্রুত দাম কমতে শুরু করে। আজ শনিবার সাঁথিয়ার পাইকারি পেঁয়াজের হাট করমজা চতুরহাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। ছোট আকারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে আরও কম দামে—৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে। এমন দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ কৃষকেরা বাড়ি ফিরছেন।
উৎপাদন খরচ ও কৃষকদের বক্তব্য
সাঁথিয়া উপজেলার বায়া গ্রামের কৃষক মনসুর আলী, কাশিনাথপুরের বাবলু শেখ ও ইমদাদুল হক জানান, গড়ে প্রতি মণ পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও তাঁরা প্রতি মণ পেঁয়াজ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভে বিক্রি করছিলেন। হঠাৎ দাম অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় এখন প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, মাঠে এখনো প্রচুর পেঁয়াজ রয়েছে। লোকসানে বিক্রি করে অনেক কৃষক চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরছেন।
সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডুরিয়া গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধারদেনা করে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলাম। এখন পেঁয়াজ বিক্রি করে খরচই উঠছে না। তাই ধারদেনা শোধ তো দূরের কথা, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
আড়তদারদের বিশ্লেষণ ও কারণ
সাঁথিয়া উপজেলার করমজা চতুরহাটের আবদুল মুন্নাফ এবং বোয়াইলমারী হাটের রাজা হোসেন নামের দুই পেঁয়াজ আড়তদার বলেন, অর্ধেকের বেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ ইতিমধ্যে উঠেছে। মাঠে থাকা পেঁয়াজের বেশির ভাগই পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকেরা দ্রুত তুলছেন। ফলে হাটে সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় ক্রেতার চাহিদা কম। রমজানের শুরুতে পেঁয়াজের চাহিদা কিছুটা কম থাকে। এ ছাড়া ৮-১০ দিনের মধ্যে নতুন হালি পেঁয়াজ হাটে উঠবে। এসব কারণেই দাম কমেছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ প্রতি মণে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। সেখানে ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করে কৃষকেরা চরম হতাশ। এমন দামের কারণে কেউ কেউ জমি থেকে পেঁয়াজ তোলাও বন্ধ করে দিয়েছেন।
কৃষি লক্ষ্যমাত্রা ও আবাদ পদ্ধতি
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, সাঁথিয়া উপজেলায় এ বছর ১৬ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ। পাবনায় মুড়িকাটা ও হালি—এই দুই পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ হয়। মুড়িকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বরে আবাদ করা হয় এবং ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা হয়। অন্যদিকে হালি পদ্ধতিতে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে পেঁয়াজ তোলা হয়।
