শর্ষে উৎপাদনে শীর্ষে সিরাজগঞ্জ: চলনবিলের পলিমাটি ও মধু সংগ্রহে রেকর্ড
শর্ষে উৎপাদনে শীর্ষে সিরাজগঞ্জ, চলনবিলের ভূমিকা

শর্ষে উৎপাদনে দেশের শীর্ষ জেলা সিরাজগঞ্জ

শর্ষে উৎপাদনে বাংলাদেশের শীর্ষ জেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার একটি মাঠে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, হলুদ শর্ষের সমারোহে ভরা বিশাল ক্ষেত। এই জেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল, যার পলিমাটি সিরাজগঞ্জকে অনন্য করে তুলেছে।

চলনবিলের ভূমিকা ও উর্বর মাটি

চলনবিলের পানিমিশ্রিত পলিমাটি সিরাজগঞ্জ জেলাকে সারা দেশ থেকে আলাদা করেছে। কৃষিবিদদের মতে, এই মাটির উর্বরতা শর্ষে আবাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। জেলাটিতে চলনবিলকে কেন্দ্র করে আরও ৫২টি ছোট–বড় বিল রয়েছে, যা বর্ষায় পানি বিস্তৃত করে এবং শুষ্ক মৌসুমে ফসলের আবাদে সহায়তা করে।

ফলন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

চলতি অর্থবছরে সিরাজগঞ্জ জেলায় ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে শর্ষের চাষ হয়েছে, যেখান থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার টন উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই জেলায় ১ লাখ ২৮ হাজার টন শর্ষে উৎপাদিত হয়েছিল, যখন সারাদেশে মোট উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ টন।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা জানান, শুধু শর্ষের বাজার মূল্য ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এছাড়া, এবার জেলা থেকে ৪ লাখ ৪ হাজার কেজি মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার বাজারমূল্য ১৩–১৪ কোটি টাকা। গত বছর সাড়ে তিন লাখ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়েছিল, এবং এবার ২৫৮টি প্রতিষ্ঠান শর্ষে থেকে মধু সংগ্রহ করছে।

উল্লাপাড়ার নেতৃত্ব ও অন্যান্য জেলা

একক উপজেলা হিসেবে উল্লাপাড়া শর্ষে উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে এবার প্রায় ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে শর্ষের চাষ হয়েছে। সিরাজগঞ্জের পরই শর্ষে উৎপাদনে এগিয়ে আছে টাঙ্গাইল জেলা, যেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৮ হাজার টন উৎপাদন হয়েছিল। তৃতীয় অবস্থানে রাজশাহী জেলা প্রায় ৯৭ হাজার টন, চতুর্থ মানিকগঞ্জ ৯২ হাজার টন, এবং পঞ্চম নওগাঁ ৮৮ হাজার টন উৎপাদন করেছে। এই পাঁচ জেলার মোট উৎপাদন ৫ লাখ ২৪ হাজার টন, যা দেশের মোট উৎপাদনের এক–তৃতীয়াংশ।

নতুন জাত ও সরকারি সহায়তা

দেশে গত তিন বছরে শর্ষের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে, যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৬ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত বীজ ও উপকরণ সরবরাহ এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বারি সরিষা-২০ জাতটি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয় এবং মাত্র ৮৫ দিনে সংগ্রহযোগ্য।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে সার ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দেশের ২৫০টি উপজেলায় সহায়তা করছে। প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, কৃষকদের উৎসাহিত করতে শর্ষের পাশাপাশি ধানের বীজও বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাজার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

উৎপাদিত শর্ষের বড় ক্রেতা হিসেবে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, যেখানে এসিআই, প্রাণ, সিটি, স্কয়ার, ফ্রেশ ও ওরিয়ন গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিরাজগঞ্জের চলনবিলের পলিমাটি ও সরকারি প্রকল্পের সমন্বয়ে শর্ষে উৎপাদন ও মধু সংগ্রহে নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।