গাইবান্ধার চরাঞ্চলে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট: রাখালদের দৈনিক ১৮ কিলোমিটার হাঁটার লড়াই
শীতের নরম রোদে ঝলমল করা বিস্তীর্ণ সাদা বালুচরের দৃশ্য গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলে দেখা যায়। দূরে সরু নীল রেখার মতো বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ, কিন্তু চারদিকে ধুধু বালি ছাড়া ঘন সবুজের ছায়া বা পর্যাপ্ত ঘাসের প্রাচুর্য নেই। এই শূন্যতার মাঝেই প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে ১৫ থেকে ১৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে বেড়ায় গরুর এক একটি পাল। পথের ক্লান্তিতে মাঝ বালুচরেই কখনো শুয়ে পড়ে তারা, আর পাশে গামছা বিছিয়ে বা বালির ওপরই শুয়ে বিশ্রাম নেন রাখাল। চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা গেলেও, থেমে থাকে না জীবনের এই কঠিন লড়াই।
রাখাল মফিজ উদ্দিনের দৈনন্দিন সংগ্রাম
উপজেলার ভরতখালী এলাকার রাখাল মফিজ উদ্দিন ভোর হতেই গরুর পাল নিয়ে বের হন। একসময় তাঁর গরু ছিল ১৮টি, কিন্তু সম্প্রতি একটি হারিয়ে যাওয়ায় এখন রয়েছে ১৭টি। সেগুলো নিয়েই তিনি চর থেকে চরে ঘুরে বেড়ান, কখনো নদীর ধারে, কখনো দূরে কোথাও সবুজ ঘাসের ক্ষীণ আভাস দেখলে সেদিকে ছুটে যান। মফিজ উদ্দিন বলেন, “চরে ঘাসের পরিমাণ খুবই কম। না হাঁটালে গরু খেতে পায় না, তাই কষ্ট হয়, কিন্তু এটাই আমাদের জীবিকা।” দীর্ঘ পথ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়লে গরুগুলো বালুচরেই বসে পড়ে, আর তখন সূর্যের বিপরীত দিকে শুয়ে পড়েন মফিজ। মাথার গামছা খুলে ঘাম মুছতে মুছতে তিনি আকাশের দিকে তাকান, মনে প্রশ্ন জাগে—কবে মিলবে একটু বেশি ঘাস, একটু নিশ্চিন্ত দিন?
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা ও জীবনযাত্রার চ্যালেঞ্জ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে চর ডুবে যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠে বিশাল বালুচর। তখনই প্রকট হয় খাদ্যসংকট, এবং ঘাসের অভাবে গরুগুলোকে দূরদূরান্তে হাঁটানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও গবাদিপশু যেন একই সুতোয় বাঁধা, নদীর ভাঙন, জোয়ার-ভাটা আর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেই টিকে থাকতে হয় তাদের।
ধুধু বালুচরের বুকেই তাই প্রতিদিন লেখা হয় সংগ্রামের গল্প। গরুর পালের পেছনে ধীর পায়ে হাঁটেন এক নীরব রাখাল—জীবিকার তাগিদে, আশার টানে, এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এই পরিস্থিতি শুধু গাইবান্ধার চরাঞ্চলেই নয়, দেশের অন্যান্য নদী তীরবর্তী অঞ্চলেও দেখা যায়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
