রাজশাহীতে আমের মুকুলে ভরা বাগান, কৃষকদের বাম্পার ফলনের আশা
শীত মৌসুমের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই রাজশাহী অঞ্চলের আমগাছগুলো মুকুলে ভরে উঠছে। দেশব্যাপী সুস্বাদু আম উৎপাদনের জন্য খ্যাত এই অঞ্চলের বাগানগুলোতে এবার ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। প্রাথমিক পর্যায়ে মুকুলের প্রাচুর্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ফসল তোলা পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা জাগাচ্ছে।
মুকুলের প্রাচুর্য ও কৃষকদের প্রস্তুতি
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে মুকুলের ঘ্রাণ। কৃষকরা মুকুল আসার আগেই গাছের প্রাথমিক পরিচর্যার কাজ সম্পন্ন করেছেন। বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়া উপজেলার আমবাগানে মুকুলের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকরা মুকুলকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ছিটিয়েছেন।
চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রামের আমচাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘এবার বাগানে আগেভাগেই মুকুল এসেছে। যদি কুয়াশায় নষ্ট না হয়, তাহলে বিপুল আম উৎপাদন হবে।’ অন্য এক চাষি মাহফুজ আলী যোগ করেন, ‘তিনি সারাবছর গাছের যত্ন নেন বলে ভালো ফলন পান। তবে হপার বা শোষক পোকা সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে আম উৎপাদন কমে যেতে পারে।’
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও গবেষণা কেন্দ্রের মূল্যায়ন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়, যাতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য আবারও ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার মুকুল বেশ আগেভাগেই এসেছে। কিছু গাছে এখন মুকুল আসতে শুরু করেছে, তবে সবগুলো গাছে মুকুল আসবে কিনা তা বুঝতে আরও সময় লাগবে। আশা করা যায়, এবার গত বছরের তুলনায় বেশি মুকুল আসবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘কৃষকদের বাগান পরিচর্যায় ওষুধ ছিটানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কুয়াশায় বড় ধরনের ক্ষতি না হলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
অঞ্চলভিত্তিক আম চাষের প্রবণতা ও পরিবর্তন
এই অঞ্চলের জেলাগুলোতে নতুন আমবাগান, বিশেষ করে আম্রপালি এবং বারি আম-৩ ও ৪ জাতের আমের চাষ প্রতি বছরই বাড়ছে। নওগাঁ দীর্ঘদিন ধরে ধান চাষের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু গত বছর এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ছাড়িয়ে সর্বাধিক আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ড. শফিকুল বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখনও সর্বাধিক জমিতে আমবাগান রয়েছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে নওগাঁয় আমচাষের জমি দেড়গুণ বেড়েছে।’ নওগাঁয় আমবাগানের জমি এ সময়ে ১৪ হাজার ৯২৫ হেক্টর বেড়েছে, যেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেড়েছে ৯ হাজার ৫২০ হেক্টর।
আমচাষ শুধু বাড়ছেই না, পদ্ধতিরও পরিবর্তন হচ্ছে। শত বছরের জন্য আমবাগান তৈরির পরিবর্তে কৃষকরা এখন মাত্র ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাগান করছেন, যা আধুনিক কৃষি পদ্ধতির দিকে ইঙ্গিত করে।
