বৈশাখে হাওরে বিষাদ: বন্যায় ৭৫৫ কোটি টাকার ফসল নষ্ট
বৈশাখে হাওরে বিষাদ: বন্যায় ৭৫৫ কোটি টাকার ফসল নষ্ট

বৈশাখে হাওরে বিষাদের ছায়া

বৈশাখে যেখানে হাওরে হাওরে কৃষক-কিষানিরা আনন্দে মাতোয়ারা থাকার কথা, সেখানে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে। প্রাকৃতিক বৈরী পরিবেশে হাওরবাসীর সুখের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়েছে। আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা চোখে যেন আঁধার দেখছেন। সবার মনে একই প্রশ্ন, আগামী একটি বছর সংসার চলবে কীভাবে? সেই চিন্তায় উধাও দুই চোখের ঘুম। বোরো ফসল ডুবে যাওয়ায় বেশি বেকায়দায় পড়েছেন সচ্ছল কৃষক ও গৃহস্থরা। তারা না পারছেন সহায়তার খাতায় নাম লেখাতে, না পারছেন কারো কাছে অভাবের কথা বলতে। এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার পরিস্থিতি পরিদর্শনে ও ত্রাণ সহায়তা দিতে এলাকায় সফর করবেন কৃষি ও মত্স্য মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুল রশিদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

নদীর পানি বাড়ছে

সুনামগঞ্জে সুরমাসহ বিভিন্ন নদীর পানি প্রতি ঘণ্টায় ১ সেন্টিমিটার বাড়ছে। গুরমার হাওরসহ কয়েকটি স্থানে পানির চাপে হাওর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে পড়লে সেগুলো মেরামত করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাইসার আলম সুনামগঞ্জে কয়েক দিন থেকে অবস্থান করে এগুলো দেখাশোনা করছেন। প্রকৌশলীরা জানান, বাঁধ নিয়ে আপাতত টেনশেন নেই। কিন্তু হাওরে অনেক ধান কাটার বাকি। সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোশারফ হোসেন সোমবার সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৯১৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ ৭৫৫ কোটি টাকা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধান কাটা ব্যাহত

তিনি জানান, হাওরে ধান কর্তন হয়েছে ৭৮ ভাগ। নন হাওরে ৩৭ ভাগ। সিলেটের চার জেলায় ৬০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। তবে সুনামগঞ্জে শ্রমিকের অভাবে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। এপ্রিলের শেষ থেকে বৃষ্টি : বৈশাখের তৃতীয় সপ্তাহেও রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ চলছে সিলেটের কৃষি পরিবারগুলোর। প্রতিক্ষণ রোদের প্রতিক্ষায় থাকেন কৃষকেরা। এবার বোরো ধান পাকার আগেই জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় শত শত একর কাঁচা-পাকা ধান। পানিতে ভাসছে পাকা ধান। হারভেস্টার মেশিনের সংকটের সঙ্গে শ্রমিক পাওয়াও দুষ্কর। পাওয়া গেলেও অবিশ্বাস্য মজুরি হাঁকছেন। তাই কোন কোন কৃষক নিরুপায় হয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়েই ধান কাটায় নেমে পড়েছেন। রোদের অভাবে সেই কাটা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাওরপাড়ে হাহাকার

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জানি গাওয়ের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, ১৩ কিয়ার (১ কিয়ার ৩০ শতাংশ) জমি চাষ করেছিলেন। পানি থেকে ধান কেটে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ভারী ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এখন তাতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক সংসারের খরচ চালাতে ভিজা ধান বিক্রয় করে দিচ্ছেন। কিন্তু ভিজা ধান মাত্র ৬শ থেকে ৭শ টাকায় কিনছেন ফড়িয়ারা। অথচ সরকার এক মণ ধানের মূল্য নির্ধরণ করেছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। সুনামগঞ্জের দিরাইর ছায়ার হাওরের কিষানিদের বিলাপ করতে দেখা গেল। এদের ঘরে খাবার নেই। কি করে সারা বছর চলবে, নিজেরা জানে না। জামালগঞ্জের সুখি ও বড় গৃহস্থ তৌহিদ চৌধূরী প্রদীপ ও তার ভাই তোফায়েল আহমদ চৌধূরী দুজনে মিলে পাগনার হাওরে ৫০ কিয়ার বোরো জমি চাষ করেছিলেন। সব ধান জলাবদ্ধতায় ডুবে গেলে তারা এখন পাগালপ্রায়। পানির ওপর ভেসে আছে তার কষ্টের সোনালি ধান। শ্রমিকের অভাবে সেগুলো কেটে ডাঙায় আনা যাচ্ছে না। প্রদীপ জানান, মাত্র ৬ কিয়ার ধান কোন রকমে কেটেছেন, যেগুলো শুকাতেও পারছেন না।

ধান শুকানোর খলায় করুণ দৃশ্য

ধর্মপাশার টাগার হাওরে কৃষক জাহাঙ্গির আলম চাষ করেছিলেন ১০ কিয়ার জমি। তার আশা ছিল অন্তত দুইশ মণ ধান ঘরে তুলতে পারবেন। কিন্তু জলাবদ্ধতায় তার সব শেষ। একই অবস্থা অন্য কৃষকদেরও। ধান তোলার মৌসুমের এবার সেই চিরচেনা আনন্দে মেতে ওঠার দৃশ্য নেই। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বৃহত্ ধান শুকানোর খলা বাওনের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের তেমন আগ্রহ নেই বৈশাখীতে। স্থানীয় কৃষক শামছুল ইসলাম বাওনের পাড়ে পচা ধান ও খড় নাড়ছিলেন। তিনি জানালেন, প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ করে শিয়ালমারা হাওরে ১০ একর জমি চাষ করেছিলেন। সেগুলোর সবই পানির নিচে গেছে। এক একর জমির ধান কেটে আনতে পারলেও টানা বৃষ্টিতে ধানে এখন চারা গজাচ্ছে। তবুও জীবিকার তাগিদে বাড়ির উঠোনে পচা ধানগুলো শুকাচ্ছিলেন তিনি। বুড়িস্থল গ্রামের তিনশ পরিবারের মধ্যে অর্ধেক পরিবারের এই দশা। একই পরিস্থিতি শিয়ালমরা হাওরবাসীরও। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের শান্তিপুর, অনন্তপুর, কীর্ত্তিনগর, ধনপুর, যোগীরগাঁও, বাদেসাধকপুর, ঢুপিকোণা গ্রামে গিয়ে দেখা গেল ধান নষ্ট হবার করুণ দৃশ্য। সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ইত্তেফাককে জানান, সিলেট বিভাগের চার জেলায় এবার জলাবদ্ধতায় ৩৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে ২০ হাজার ৫৫৬ হেক্টর। হবিগঞ্জে ৯ হাজার ৮৩৮ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৯৯০ হেক্টর, সিলেটে ৫২৯ হেক্টর। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতির পরিমাণ ৭১৩ কোটি টাকা।

সরকারি উদ্যোগ

এদিকে, এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারিভাবে রবিবার থেকে সিলেটের চার জেলা ও নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় সরকার ধান কেনা শুরু হয়েছে। সিলেটের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা এস এম সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কৃষকরা যাতে ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রয় করতে পারেন সে জন্য একটু আগে এই অঞ্চলে ক্রয় অভিযান শুরু হয়েছে। এবার সিলেটের ৪৪ টি সরকারি খাদ্য গুদামের মাধ্যমে ৪৩ হাজার ৬৯৪ মে.টন ধান প্রতি কেজি ৩৬ টাকা ও ৪১ হাজার ৯৩৩ মে.টন চাল ক্রয় করা হবে প্রতি কেজি ৪৯ টাকা মূল্যে। আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিভাগের সাড়ে ৫শত মিলকে অনুরোধ করা হয়েছে তারা যেন মানবতার খাতিরে কৃষকের ভেজা ধান শুকিয়ে দেন। অনেকেই জানালেন, তারা সরকার নির্ধরিত ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাই ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করছেন পানির দরে। এদিকে, প্রতি বছর এমন দুর্যোগে হাওরবাসী যেন ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। এ কারণে কৃষিতে অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।