সুনামগঞ্জে আবহাওয়া অস্থিতিশীল থাকায় হাওরাঞ্চলের কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। টানা দুই দিন রোদের পর শনিবার আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান কাটা ও শুকানো নিয়ে নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। রোববার সারাদিন বৃষ্টি না হলেও রোদের তাপে কৃষকরা ধান কাটা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্বস্তির নয়; হাওরে আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। জেলার ১২টি উপজেলার সব হাওড়জুড়ে এখন উদ্বেগ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে কৃষক-কৃষাণীদের চোখে-মুখে।
বিভিন্ন হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই হিসেবকে মনগড়া বলে আখ্যায়িত করে কৃষকদের দাবি আদায়ের সংগঠন ‘হাওড় বাঁচাও আন্দোলন’ দাবি করছে, এ পর্যন্ত হাওড়ের ৫০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। শনিবার (২ মে) পর্যন্ত ৫৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। তাদের প্রাথমিক জরিপে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। আরও কয়েক দিন গেলে পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে।
কৃষক নেতার বক্তব্য
‘হাওড় বাঁচাও আন্দোলনের’ সাংগঠনিক সম্পাদক কুদরত পাশা বলেন, “কৃষি বিভাগ এবার কলম দিয়ে ধান কাটছে। ৫৫ ভাগ ধান কাটার যে তথ্য তারা দিচ্ছেন তা আদৌ সত্য নয়। কৃষকরা কিছু পরিমাণ ধান কেটেছিলেন সত্য, কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেই ফসল গোলায় তুলতে পারেননি। খলায় থাকা ধানে চারা গজিয়ে গেছে। রোদের অভাবে শুকাতে পারেননি তারা। আর যে ধান হাওড়ে আছে, তার অর্ধেকেরও বেশি পানির নিচে। পানির নিচের ধান শ্রমিকরা কাটতে চায় না। সবকিছু মিলে সুনামগঞ্জের কৃষকরা এবার ৩০% ধান ঘরে তুলতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে।”
কৃষকদের দুর্ভোগ
দেখার হাওড়ের কৃষক সামসুউদ্দিন বলেন, “হাওড়ে শ্রমিক নেই, কারণ হাওড়ে প্রায় গলা সমান পানি। এখন শ্রমিকরা ধান কাটতে চায় না। তারা অপেক্ষায় আছে আমরা হাওড় ছেড়ে বাড়িতে চলে গেলে তারা পানির নিচ থেকে নিজেদের মতো ধান তুলবে। সেই ধানে আমাদের কোনো ভাগ থাকবে না। এই ধান ফলাতে যে খরচ হয়েছে, তার জন্য ধার-দেনা করতে হয়েছে। এখন ধার-দেনা দেব কেমনে আর সারাবছর চলব কেমনে? এই চিন্তায় রাতেও ঘুমাতে পারি না। সরকার যদি পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।”
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওড়পাড়ের কৃষক দিলদার হোসেন বলেন, “অব্যাহত বৃষ্টিতে হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা অবস্থায় আছি। গত বৃহস্পতি-শুক্রবার দুই দিন আবহাওয়া কিছুটা ভালো হওয়ায় ডুবে যাওয়া ধান কেটে কিছুটা শুকাতে পেরেছিলাম; কিন্তু শনিবারের বৃষ্টিতে আবার হতাশা বাড়িয়েছে। রোববার রোদ ওঠায় সারাদিন ভালো কেটেছে, ধান শুকাতে পেরেছি। কিন্তু কাল আবহাওয়া কীভাবে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। একটা সপ্তাহ বৃষ্টি না থাকলে কাটা ধান কিছুটা বাড়িতে নিতে পারতাম; কিন্তু পূর্বাভাস ভালো না, তাই মহাদুশ্চিন্তায় আছি।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য
রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানির স্তর ৪.৭৫ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপৎসীমার ১.৩০ মিটার নিচে অবস্থান করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি ২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে জেলায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভালো নয়। আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।”
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত জরিপ করে পেয়েছি, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওড়ের প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা উপজেলাভিত্তিক করা হচ্ছে। আমরা নিয়মিত হাওড়ের খোঁজ রাখছি। কয়েক দিন গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।”
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, আর যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও ঠিকমতো শুকাতে না পারায় পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দিনরাত পরিশ্রম করে উৎপাদিত ফসল হারানোর আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। অনেকেই বলছেন, প্রকৃতির সঙ্গে এই লড়াইয়ে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হাওড়জুড়ে এখন উদ্বেগ আর হতাশার চিত্র।



