ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় নিজের ছয় বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে ডুবে যেতে দেখে আহাদ মিয়া (৫৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২ মে) উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
কৃষকের শেষ দৃশ্য
মৃত আহাদ মিয়া ওই গ্রামের হরমুজ আলীর ছেলে। তিন সন্তানের জনক তিনি ধার দেনা করে ছয় বিঘা জমি আবাদ করেছিলেন। সকালে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে গিয়ে দেখেন নিজের জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। এ দৃশ্য দেখে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য আহামেদ আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, 'চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যেতে দেখে মানুষটা সহ্য করতে পারেনি।' আহাদ মিয়ার ভাতিজা মোহাম্মদ ফারুক আহমেদও তার চাচার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বন্যার বিস্তৃতি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা, ঝামারবালি ও কদমতলি—এই তিন গ্রামের অন্তত তিন হাজার বিঘা জমি নতুন করে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু সোনাতলা গ্রামেই দেড় থেকে দুই হাজার বিঘা জমি ডুবে গেছে। ঝামারবালি ও কদমতলিতেও বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
একই ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের আরেক কৃষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, 'মায়া লাগে, তাই জমিতে আসি।' পুটিয়া বিলের পাঁচ বিঘা জমিতে স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ, ধারদেনা, এনজিও থেকে ঋণ—সব মিলিয়ে একটাই আশা ছিল, পাকা ধান ঘরে তুলবেন। কিন্তু সেই ধানই যখন চোখের সামনে পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। জমির আইলেই হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পাশে থাকা কৃষকেরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে প্রাণে বাঁচান।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাহাকার
ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের এ ঘটনার মতোই আরও শত শত কৃষক পাকা ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে হতাশা, আবার কারও শরীরই আর এই ধাক্কা নিতে পারছে না। তলিয়ে যাওয়া জমি দেখে অসুস্থ হয়ে আরও দুজন কৃষক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
সোনাতলা গ্রামের কৃষক খলিল মিয়া বলেন, '১০ বিঘা জমি করছিলাম ঋণ নিয়ে। এখন ৮ বিঘাই পানির নিচে। এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে যাবে।' ঝামারবালি গ্রামের কৃষক শাহাজান মিয়ার কণ্ঠেও আক্ষেপের কথা। তিনি বলেন, 'নির্বাচন এলে সবাই আসে, কিন্তু এখন কেউ নেই। কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনার তালিকা হলেও আমাদের এলাকার হাজার হাজার কৃষক বঞ্চিত।' কৃষক রহমত আলী বলেন, 'তিন বিঘা জমি কেটে এনেছি ৪ দিন হয়েছে। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সব ধান পচে গন্ধ বের হচ্ছে। বাকি চার বিঘা জমি পানির নিচে আছে।'
কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান সাকিল জানান, দুই দিন আগেও প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি তলিয়ে গিয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে আরও দুই থেকে তিন হাজার বিঘা জমি নতুন করে তলিয়েছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর শুনে ঘটনাস্থলে আমাদের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে নিহতের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাছরিন বলেন, 'একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর পেয়েছি, আরও কয়েকজন স্ট্রোক করে চিকিৎসাধীন আছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কৃষি কর্মকর্তাকে সরেজমিন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে প্রকৃত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।'



