হাওরে কৃষকের বোবাকান্না, তলিয়ে যাচ্ছে সোনার ফসল
হাওরে কৃষকের বোবাকান্না, তলিয়ে যাচ্ছে সোনার ফসল

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে ৯৫ ভাগ মানুষের প্রধান খাবার ভাত। এই খাদ্যের বড় একটি অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে প্রতি বছর কৃষকরা ফসল ফলান। দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর সন্তানের মতো মমতা দিয়ে তারা ধান উৎপাদন করেন। যখন ধান সোনালি রঙ ধারণ করে, তখন সব কষ্ট ভুলে হাসিতে ভরে ওঠে কৃষকের মুখ। তারা স্বপ্ন দেখে এই ফসল বিক্রি করে বাড়িতে একটি পাকা টয়লেট দেবেন, বৃষ্টিতে চুইয়ে পড়া টিনের ছাদ বদলাবেন, সারের দোকানের বাকি টাকা শোধ করবেন এবং টিউবওয়েল বসাবেন—যাতে স্ত্রী-কন্যাদের পানির জন্য অন্যের বাড়িতে যেতে না হয়।

স্বপ্ন ভেঙে দেয় বন্যা

কিন্তু কৃষকের এই স্বপ্নগুলো যেন ছেঁড়া কাঁথায় লাখ টাকার স্বপ্ন বোনার মতো। এলোমেলো ভাবনাগুলোকে অপরাধ বলে মনে হয়। কারণ মৌসুমের শুরুতে অতিবৃষ্টি ও বাঁধ ভেঙে এবারও ফসল তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কিছু ধান কাটা হলেও রোদে না দেওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে হাওর অঞ্চলে।

কাটা ধান ভেজা থাকায় অঙ্কুর বেরিয়ে যায়, ফলে বাজারে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কৃষককে বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও ওঠে না। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ হাওড় এলাকায় ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষকের হাহাকার

নেত্রকোনার মদনের বৃদ্ধা সাইকুলের মা বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছেলেদের ডুবে যাওয়া ধান তুলতে দেখছিলেন। তার এক ছেলের স্ত্রীর সিজার হবে, টাকা নেই। মহাজনের ঋণ শোধের পথ নেই। তিনি বলেন, ‘খাই কইত্ত ভাত নাই, এহন কন্টইলে চাল কিন্নে আইন্নে খাইতেছি।’

সুনামগঞ্জের হালুয়ারগাঁও এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধার-দেনা কইরা সার বীজ কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ অইবো, আর কেমনে কী করবাম জানি না।’

এটাই হাওড়বাসীর চিত্র। চোখের সামনে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিছুই করতে পারছে না। সারা বছর খাবে কী? ফসল ফলাতে ধারদেনা হয়েছে, তা পরিশোধ করবে কীভাবে—এই চিন্তায় চোখেমুখে হতাশা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাওড়ের অর্থনীতি ও ঋণের বোঝা

হাওড়ে ছয় মাস পানি থাকে, বাকি সময় কৃষক ফসল উৎপাদনে ব্যস্ত থাকেন। এখানে দুই ধরনের সুদ বাণিজ্য চলে: এক, প্রান্তিক কৃষক বা জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নেন; দুই, ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ। এবারও সুদের টাকায় অনেক কৃষক স্বপ্নের ফসল ফলাতে মাঠে নেমেছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন চোখের সামনে ফিকে হয়ে গেছে। ঋণের বোঝা ও খাদ্যের অভাবে কীভাবে বাঁচবেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া কীভাবে করাবেন—এসব ভাবনায় তারা বিপর্যস্ত।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘হাজার হাজার কানি ক্ষেত এখন পানির তলে। ধানটা লাল হয়ে আসছিল, কমলার মতো রং। সকাল কাজ করে আসলাম, আর দুপুরে গিয়া দেখি পানি। কাটার সময়ই পাইলাম না। পরদিন পুরোটাই তলায়া গেল।’

নয়নভাগা প্রথা

হাওরাঞ্চলে ‘নয়নভাগা’ নামে একটি প্রচলিত প্রথা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জমির মালিক ধান কাটতে না পারলে অন্যরা এসে তা কেটে নিয়ে যায়, আর মালিক অসহায়ভাবে তা দেখেন। নেত্রকোণার কৃষক মিলন ব্যাপারী বলেন, ‘আর কয়েকটা দিন সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। কিন্তু উজানের ঢলের পানি সবকিছু ডুবিয়ে দিল। পানির নিচে থাকা ধান আর কাটা সম্ভব না—সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন অন্য লোকজন এসে নয়নভাগায় ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। দেনা শোধ ও সংসার চালাবো কীভাবে।’

কৃষির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতির অনেকাংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো কৃষি পেশার সাথে জড়িত। প্রান্তিক কৃষকরা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই অভিজ্ঞতার আলোকে চাষাবাদ করে সোনার ফসল ফলান। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ—সব কিছুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তারা ফসল উৎপাদন করে। তাদের ঘামে ফলানো ফসল ১৮ কোটি মানুষ খেয়ে বেঁচে থাকে।

এই কৃষকের করের টাকায়, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে রিচার্জ থেকে কাটা ১৫ শতাংশ টাকায় পদ্মা সেতু হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট আসে। তাদের ঘামে দাঁড়ানো অর্থনীতির ওপর ভর করে আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের জামা, জুতা ও সুগন্ধি ব্যবহার করি, অথচ তাদের উৎপাদিত ফসল রক্ষায় আমরা নির্বিকার।

সমন্বিত পরিকল্পনার জরুরি প্রয়োজন

সিলেট কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চার জেলায় ৩০ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সুনামগঞ্জে ১৯ হাজার ৩২৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে ৮ হাজার ৬৫৩ হেক্টর, সিলেটে ৩২৭ হেক্টর এবং মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৫৯৯ হেক্টর জমি রয়েছে। নেত্রকোণায় ১৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর এবং কিশোরগঞ্জে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে আবেদন, এই মানুষগুলোকে অবহেলা না করে তাদের কৃষি টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিন। খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে দেশে শস্যের মজুদ পর্যাপ্ত না থাকলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও ১৮ কোটি মানুষের দেশ টিকে আছে কৃষক-শ্রমিকের উৎপাদনের ওপর ভর করে।

আর দেরি না করে বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে হাওর অঞ্চলের ফসল রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এমন পরিকল্পনা করুন যাতে ফসল আবাদের সময় পর্যাপ্ত পানি থাকে, আবার ফসল কাটার সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে। মিঠা পানির মাছও যেন বাঁচে। কৃষি ঠিক রেখে হাওর ঘিরে ইকো ট্যুরিজমের মাধ্যমেও রাজস্ব আয় সম্ভব।