শুক্রবার ভোর। আলো ফোটার আগেই সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া বাজার জেগে ওঠে শত শত ধানকাটা শ্রমিকের হাঁকডাকে। একদিকে জমির মালিক, অন্যদিকে কৃষিশ্রমিক—দুই পক্ষের দরদামে সরগরম হয়ে ওঠে বাজারের মধ্যভাগ। মে দিবসের দিনেও এখানে নেই ছুটি, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা; আছে শুধু জীবিকার লড়াই।
শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি
কয়েক দিন ধরেই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে এই বাজারে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর এবং পাশের তাড়াশ উপজেলা থেকে গৃহস্থরা এখানে শ্রমিক নিতে আসছেন। মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাড়াশ উপজেলার কাঁটাগাড়ি এলাকার কৃষক মোবারক হোসেন খান জানান, ঝড়বৃষ্টিতে খেতের পাকা ধান নুয়ে পড়েছে, অনেক জায়গায় পানি জমেছে। এতে দ্রুত ধান কাটার চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গতকাল আটজন শ্রমিক এক বিঘা জমির ধান কেটে বাড়িতে তুলে দিয়েছেন। আজ আরও বেশি শ্রমিক নিতে এসেছি। এর মধ্যে ২৪ জনকে পাঠিয়ে দিয়েছি, আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হচ্ছে।’ প্রতিজন শ্রমিককে ৬৫০ টাকা মজুরি ও দুই বেলা খাবার দিতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ছোনকা এলাকা থেকে শ্রমিক নিতে আসা আবদুল খালেকও একই বাস্তবতার কথা বলেন। তিনি জানান, শ্রমিকেরা দিনে ৬৫০ টাকা মজুরি ও দুই বেলা খাবারে রাজি হয়েছেন, সঙ্গে যাতায়াতের জন্য অটোরিকশার ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে।
কৃষকদের কথা
কৃষকেরা বলছেন, ধানের বাজারদর কম হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। উপজেলার বেতুয়া এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাটে ধানের দাম কম, কিন্তু কাটতে কামলার খরচ অনেক বেশি।’ একই ধরনের কথা বললেন আরও কয়েকজন কৃষক।
শ্রমিকদের অসন্তোষ
তবে এই মজুরি নিয়েও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন শ্রমিকেরা। খামারগাঁতী এলাকার তাজের আলী বলেন, ‘ঝড়বৃষ্টিতে খেতে পানি জমেছে, ধানগাছ হেলে পড়েছে। এ অবস্থায় ধান কাটা অনেক কষ্টের।’
এলাকার প্রবীণ আবদুস সালাম মুন্সী বলেন, ধানগড়া বাজারে একসঙ্গে অনেক কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায়। তাই বিভিন্ন এলাকা থেকে গৃহস্থেরা এখানে শ্রমিক নিতে আসেন।
শিক্ষার্থী শ্রমিক
বাজারে কথা হয় দুজন শ্রমিকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানায়, কলেজে পড়ালেখার পাশাপাশি ধান কাটার মৌসুমে প্রায় এক মাস কাজ করে তারা কিছু টাকা জমান। পরিবারের খরচে সহায়তা করার পাশাপাশি সেই টাকা পড়ালেখায় ব্যয় করেন। মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘আজ শ্রমিক দিবস। কিন্তু আমাদের জন্য আলাদা করে কোনো দিন নেই। কাজ করলে টাকা পাব, কৃষকের ঘরে ধান উঠবে—এটাই বড় কথা।’



