সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ও উজানের বৃষ্টির কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে এতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
দেখার হাওরে করুণ চিত্র
বুধবার দেখা হাওরের গুয়াচুরা এলাকায় কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন শ্রমিকরা। ঠান্ডা পানির হাত থেকে বাঁচতে পলিথিন জড়িয়ে কাজ করছিলেন তারা। পাশেই কৃষক রইছ মিয়া কাটা ধানের আঁটি বাঁধতে ব্যস্ত। চোখে পানি এসে গিয়েছিল তার। তিনি বলেন, ‘সব তলিয়ে গেছে, পানির উচ্চতা তিন-চার ফুট। কীভাবে ধান কাটব, শুকাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’ তিনি ১৯ বিঘা জমিতে বর্গা চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
রইছ মিয়া বলেন, ছয় বিঘা জমির ধান কাটলেও শুকাতে পারেননি। বাকি ছয় বিঘা জমির ধান কাটা অনিশ্চিত। জমির মালিককে বিঘাপ্রতি চার মণ ধান দিতে হবে বলে তিনি জানান। তা না দিতে পারলে পরের বছর জমি পাবেন না।
অন্যান্য কৃষকের দুর্দশা
একই এলাকায় বয়স্ক কৃষক জামিলা খাতুন ও আসমা বেগম ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছিলেন। কোমর আলী জানান, তার ২০ বিঘা জমির ৭৫ শতাংশ তলিয়ে গেছে। তিনি ৭০ হাজার টাকা খরচ করে চাষ করেছিলেন।
হাওর এলাকায় প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষক বর্গাচাষি। ক্ষতির পরও তাদের জমির মালিককে নির্ধারিত অংশ দিতে হবে। এতে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সরকারি হিসাব
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, মধ্যপুর উপজেলার ইরন বিল ও জিনারিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে অন্তত তিনটি হাওরে পানি ঢুকেছে। এতে প্রায় ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। আনুমানিক ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
পানি নিষ্কাশনে সমস্যা
পানি কমতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সুনামগঞ্জ ও উজানে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে টানা বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার বিকেলে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি ছিল।
শাল্লা উপজেলায় কৃষকেরা বাঁধ কেটে ধনু নদী দিয়ে পানি মেঘনায় ফেলার চেষ্টা করলেও নিচের দিকে পানি বেশি থাকায় তা কাজে আসেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর উপায় নেই। উজানের বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়ায় অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস
সাবেক আবহাওয়াবিদ সৈয়দ আহমেদ চৌধুরী রোববার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছেন। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এ বছর ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয় হলেও স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশবিদরা বলছেন, দুর্বল পরিকল্পনা ও নদী খনন না করায় হাওর এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে।



