ভৈরব মোকামে প্রতিদিন ধানের দাম কমছে। ফলে মোকামের চিরচেনা ব্যস্ততা নেই। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তুল গ্রাম থেকে তোতা মাঝির ট্রলারটি এক হাজার ১০৫ মণ ধান নিয়ে ভৈরব মোকাম ঘাটে নোঙর করে। সব ধানই মোটা (হিরা-২) জাতের। আজ এই ধান বিক্রি হয়েছে ৬৮০ টাকা মণ দরে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও একই জাতের ধান প্রতি মণ ৭২০ থেকে ৭২৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এক বছর আগে এই সময়ে দর ছিল মণপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা বেশি।
কৃষকের প্রতিক্রিয়া
কৃষকেরা জানান, বোরো ধান কাটা শুরুর পর থেকে প্রতিদিন দাম কমছে। আবার বাড়ছে পরিবহন খরচ। দাম না বাড়লে লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। শব্দর মিয়া বলেন, ‘ফলন মন্দ হয় নাই। প্রতি একরে ৭০ থেকে ৮০ মণ হয়েছে। তবে চারা, রোপণ, দাওয়াল, মাড়াই, পরিবহন খরচ দিয়ে এই দামে লাভের টাকা ঘরে নেওয়া সম্ভব না। এখন আবার নতুন করে বাড়ছে ট্রলার খরচ।’ উসমান গণির প্রশ্ন, ‘চালের দাম এত বেশি, তাহলে ধানের দাম এত কম কেন হয়?’
মোকামের বর্তমান চিত্র
আজ সকালে ভৈরব মোকামে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে তিনটি ধানের ট্রলার নোঙর করা। একটি এসেছে অষ্টগ্রাম থেকে, দুটি হবিগঞ্জের হাওর থেকে। শ্রমিকেরা ট্রলার থেকে ধান খালাস করায় ব্যস্ত। মোকামে পাইকার কম। নেই মোকামের চিরচেনা ধানের স্তূপের দৃশ্য। পাইকার না থাকায় আড়তদারেরা ধান সরাসরি ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন।
আড়তদারদের বক্তব্য
আড়তদারেরা জানান, এবার বৈশাখ শুরুর এক সপ্তাহ আগ থেকে মোকামে ধান আসা শুরু হয়। এখনো কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন থেকে ধান আসা শুরু হয়নি। আসছে মূলত হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর থেকে। আমদানির ৯৫ শতাংশ ইরি (মোটা) ধান আসছে। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় মণপ্রতি ধানের দাম ১০০ টাকা কম। একই সঙ্গে কম আমদানিও। গত দুই বছরের এই সময়ে মোটা ইরি প্রতি মণ ৮২৫ থেকে ৮৪০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে।
পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার কাজটা করেন ব্যাপারীরা। বিভিন্ন ব্যাপারীর ধান নিয়ে ট্রলারের মাঝি আসেন মোকামে। এবার শুরুতে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের কাকাইছেও থেকে প্রতি বস্তার (৮০ কেজি) পরিবহন খরচ ধরা হয়েছে ৩৯ টাকা। পরিবহন খরচ বাড়ায় ব্যাপারীরা আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছেন। কাকাইছেও থেকে আসা মুখলেছ মাঝি বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে। এ কারণে বস্তায় চার টাকা না বাড়িয়ে উপায় ছিল না।’
ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা
১৮ এপ্রিল আজমিরীগঞ্জের কাকাইছেও থেকে ২ হাজার ২৫৬ মণ ধান নিয়ে আসেন রুবেল মাঝি। সব ধানই ছিল ইরি (মোটা) জাতের। রুবেল মাঝি বললেন, ‘ওই দিন প্রতি মণ ৭২৫ টাকা দরে বিক্রি করে গেছি। আজ ওই ধান ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমেছে। দাম না বাড়লেও পরিবহন খরচ বাড়ায় আমদানি কমে গেছে।’
ভৈরব মোকামের ঐতিহ্য
ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাধীনতাপূর্ব সময় থেকে হাওরাঞ্চলে বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, হবিগঞ্জের দিরাই, লাখাই, আজমিরীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কিছু অংশের বাণিজ্য ভৈরবনির্ভর। যুগ যুগ ধরে নদীপথে ভৈরবের সঙ্গে এসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক যোগসূত্র তৈরি হয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ার পর এসব অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য কমে এলেও শেষ হয়ে যায়নি। বিশেষ করে হাওরকে ঘিরে ভৈরবে সমৃদ্ধ ধানের মোকাম প্রতিষ্ঠা হয়। সময়ের ব্যবধানে ভৈরব মোকামের জৌলুশ কিছুটা কমে যায়। তারপরও কিছু অংশের উৎপাদিত ধান ভৈরব মোকামের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়। মোকাম থেকে ধানের ক্রেতা অঞ্চলগুলো হলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, লালমনিরহাট, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার ব্যবসায়ী ও মিলার।
আড়তদারি প্রতিষ্ঠানের মতামত
ভৈরব বাজারের ধানের আড়তদারি প্রতিষ্ঠান মহসিন মিয়া অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপক শামিম মিয়া বলেন, ‘এবার ধানের আমদানি অনেক কম। দরও কম। আবার পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বেশি। সব মিলিয়ে কী হচ্ছে, বুঝে উঠতে পারছি না।’



