রাজশাহীর আম বাণিজ্যে ‘ঢলন’ প্রথা বিলুপ্ত, কেজি দরে কেনাবেচা শুরু
রাজশাহীর আম বাণিজ্যে ‘ঢলন’ প্রথা বিলুপ্ত, কেজি দরে কেনাবেচা

রাজশাহী অঞ্চলের আম বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘ঢলন’ প্রথা বিলুপ্ত করে কেজি দরে আম কেনাবেচা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আম চাষিদের বছরের পর বছরের অভিযোগ ও দাবির প্রেক্ষিতে বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সভাকক্ষে আজ ‘আম বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. এ এন এম বজলুর রশীদ। সভায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আম চাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, বাজার ইজারাদার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম ব্যবসায়ীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

ঢলন প্রথার অপব্যবহার

সভায় জানানো হয়, আম চাষিদের এক মণ (৪০ কেজি) আমের দাম দেওয়া হলেও বাস্তবে আড়তদাররা প্রায় ৪৪ থেকে ৫৪ কেজি আম গ্রহণ করতেন। স্থানীয়ভাবে এই প্রথা ‘ঢলন’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে চাষিরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আম বিনা মূল্যে নিয়ে নেওয়া হয়, যা তাদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন সিদ্ধান্তের বিস্তারিত

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কঠোরভাবে কেজি দরে আম কেনাবেচা হবে। এছাড়া আড়তদারদের জন্য প্রতি কেজি আমে তিন টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের সব জেলায় একই বিপণন ব্যবস্থা চালু রাখতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যবসায়ীদের মতামত

দেশের বৃহত্তম আমের বাজার হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কাঁসাট বাজারের ব্যবসায়ী ওমর আলী বলেন, বর্তমানে প্রতি মণে ১০ টাকা ও প্রতি ক্রেটে ৮ টাকা করে টোল নেওয়া হয়। তিনি একটি অভিন্ন টোল নীতি চালুর আহ্বান জানান। কাঁসাটের আম চাষি আহসান হাবিব বলেন, “আম আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ঢলন প্রথার কারণে কৃষকরা প্রতি বছর ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে ৪০ কেজির বদলে ৫৪ কেজি আম নেওয়া হয়, ফলে উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বিনা মূল্যে চলে যায়।” তিনি জানান, কাঁসাট অঞ্চলে বার্ষিক আম বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ ঢলন প্রথার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

প্রশাসনের বক্তব্য

বিভাগীয় কমিশনার ড. বজলুর রশীদ বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আম চাষিরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। ঢলন প্রথা নিয়ে বহু বছর ধরে অসন্তোষ ছিল। আজকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি কমবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।” তিনি বলেন, রাজশাহী বিভাগ জুড়ে একই নিয়ম কার্যকর করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সাধারণ) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। সভায় বক্তব্য রাখেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুল কবির, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মূসা জাঙ্গী। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক শাহানা আখতার জাহান, ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মাহমুদুল আলম সাজলও উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, নতুন নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আম চাষিদের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি পূরণ হবে।