‘এই অল্প বেতন যা পাই, তা দিয়ে ফ্যামিলি চালাতে অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু কিছু করার নাই। অনেক জায়গায় চেষ্টা তো করলাম, তেমন কোথাও চাকরি তো পাই না।’ কথাগুলো বলছিলেন মো. আলাল। রাজধানীর মতিঝিলে বাফুফে গলির পাশে একটি খাবারের দোকানে কাজ করেন ২৬ বছরের এই তরুণ। প্রতিদিন মজুরি পান ৩৫০ টাকা। তা দিয়েই চলে সংসার।
আলালের সংগ্রাম
আলালের সংসার বলতে শুধু মা আর ছোট ভাই। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা যখন মারা যান, তখন আলালের বয়স ছিল ১৫ বছর। কিশোর ওই বয়সে সংসারের হাল ধরতে কাজে নামতে হয়েছিল তাঁকে। সে সংগ্রাম এখনো চলছে। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। কখনো দিনমজুর আবার কখনো অন্য পেশায় যুক্ত হলেও কোথাও থিতু হতে পারেননি।
বাফুফে গলির পাশে যে খাবারের দোকানে আলাল কাজ করেন, গত শনিবার সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। দোকানটিতে মূলত দুপুরের খাবার বিক্রি হয়। সেখানে তিন মাস ধরে কাজ করছেন তিনি। এর আগে পাশের আরেকটি খাবারের দোকানে তিন মাস কাজ করেছিলেন। কিন্তু পবিত্র ঈদুল আজহার আগে হঠাৎ ওই দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়।
সে সময়ের কথা বলছিলেন আলাল। তখন ওই খাবারের দোকানের ম্যানেজার পালিয়ে যান। অনেক লোকসান হয়েছে—এমন দাবি করে দোকানমালিকও তাঁর দুই মাসের বেতন দেননি। ফলে ঈদের আনন্দ উদ্যাপনে পরিবারের জন্য নতুন কিছু কেনা তো দূরের কথা, বাসাভাড়া ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে।
মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে রাজধানীর জুরাইনের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন আলাল। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উপজেলায়। পরিবার কেমন করে চলছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি স্বল্প যে বেতন পান, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। বিকল্প চাকরি খুঁজেও পাচ্ছেন না। তবে আশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এরশাদ আলীর ফুটপাতের দোকান
শনিবার বিকেলে কথা হয় এরশাদ আলীর সঙ্গেও। স্থান বাফুফে গলি থেকে বেশ খানিকটা দূরে মৌচাক মার্কেটের সামনে। ফুটপাতে শিশুদের খেলনা, ব্রাশসহ ছোটখাটো নানা পণ্য বিক্রি করেন তিনি। দুপুরের পর তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ফুটপাতে সাজানো দোকানের মালামাল পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে আধা ভেজা শরীরে বসে ছিলেন ৬৫ বছর বয়সী এরশাদ আলী।
পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকেন এরশাদ আলী। প্রতিদিন সেখান থেকে এসে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান চালান। বেচাকেনার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোটেও ভালো না। পুঁজি ভেঙে খরচ করছি। গতকাল মাত্র ৭০০ টাকা বিক্রি করেছি। আগে দিনে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। বেচাবিক্রি আগের মতো নাই। আর বৃষ্টি হলে তো আরও নাই।’
ফয়সালের ফুচকা ব্যবসা
মো. আলাল, এরশাদ আলীর মতো দিন ভালো যাচ্ছে না মো. ফয়সালেরও। ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ গুলিস্তানের হলমার্কেট মোড়ে ছয় বছর ধরে ফুচকা ও ডালপুরি বিক্রি করেন। গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জে। ব্যবসার সুবিধা এবং কম ভাড়ার কারণে কেরানীগঞ্জে থাকেন। সেখান থেকে প্রতিদিন গুলিস্তানে এসে বেচাকেনা করেন।
ফয়সালের পরিবার বড়। বাড়িতে মা–বাবা, ছোট তিন বোন ও দুই ভাই রয়েছে। তাঁর আয় দিয়েই পুরো পরিবার চলে। তবে আগের তুলনায় বিক্রি অনেক কমে গেছে। কোনোমতে চলছে সংসার। এরপরও আশাবাদী ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা তো ভালো না। সব জিনিসের দাম বেশি হওয়ায় মানুষ এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। সে জন্য এখন আমাদের বিক্রিও কম। পরিস্থিতি ভালো হলে হয়তো বিক্রি আবারও বাড়বে। মানুষ বেশি খাবে।’



