খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের ঘুঘরাকাটি গ্রামে ৩১ বছর বয়সী মাকসুদা খাতুনের বাড়ি। গ্রামের অন্যান্য বিবাহিত নারীর মতো তিনি শুধু একজন স্ত্রী নন; বরং নিজেকে গর্বের সঙ্গে একজন মা হিসেবে পরিচয় দেন। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে স্বামী তাঁকে ত্যাগ করলে একাই মেয়েকে বড় করে তোলার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
জীবিকার সন্ধানে নতুন পথ
নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকায় শুরুতে বাড়ির আশপাশে ছোট পরিসরে গবাদিপশু পালন করতেন। সেই আয়ে সংসার চালানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। পরে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের চেষ্টা করেন, কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সেই স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করে। তবুও মাকসুদা আশা হারাননি; বরং নতুন সম্ভাবনার খোঁজে এগিয়ে যেতে থাকেন।
জিসিএ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ
২০২১ সালে তাঁর জীবনে আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ বাস্তবায়িত জেন্ডার-রেসপন্সিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) প্রকল্প নারীদের জীবিকায়ন উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, জমি লিজ এবং কৃষি উপকরণ সহায়তা দিচ্ছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি খুলনা ও সাতক্ষীরার জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনব্যবস্থা গড়ে তুলছে। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, জীবিকা উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে চলছে কার্যক্রম।
মাকসুদা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন এবং দুই সদস্যের নারী জীবিকায়ন দল ‘গোলাপ’-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি মাটিবিহীন আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি হাইড্রোপনিকস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশ ও লবণাক্ততার মধ্যে এই প্রযুক্তি কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করে। প্রকল্প থেকে জমি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সহায়তা পাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে দলটি সফলভাবে হাইড্রোপনিকস চাষ শুরু করে। বর্তমানে তাঁরা নিজেদের পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত পণ্য বাজারে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করছেন।
গৃহভিত্তিক পানি সংরক্ষণ ও সময়ের সদ্ব্যবহার
মাকসুদার অগ্রযাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি নিজের বাড়িতেও প্রশিক্ষণের জ্ঞান কাজে লাগান। প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি একটি গৃহভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা পান, যা প্রতিদিনের মূল্যবান সময় বাঁচায়। সেই সময় তিনি এখন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড এবং মেয়ের যত্নে ব্যয় করতে পারেন।
মেয়ের শিক্ষার স্বপ্ন
মাকসুদার স্বপ্ন একদিন তাঁর মেয়ে উচ্চশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হবে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রতিটি দিন তিনি সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিটি প্রচেষ্টা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ—একটি ভবিষ্যৎ, যা তিনি গড়ে তুলছেন সাহস, আশা এবং অদম্য সংকল্প দিয়ে।
মাকসুদা খাতুন বলেন, ‘আগে ভাবতাম, আমার মেয়ে যখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়বে, তখনই তার বিয়ে দিয়ে দেব। কিন্তু জিসিএ প্রকল্প আমার সেই চিন্তাধারা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। যত বাধাই আসুক, আমি আমার মেয়েকে অবশ্যই শিক্ষিত করব। একদিন সে উচ্চশিক্ষিত হবে এবং জিসিএর মতো প্রকল্পে কাজ করে আমার মতো অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়াবে।’



