সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ, উন্মুক্ত থাকবে করমজল
সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ, করমজল উন্মুক্ত

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজননকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আজ সোমবার (১ জুন) থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনাঞ্চলটিতে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ ও পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার আওতা ও ব্যতিক্রম

এই সময়ের মধ্যে সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারীসহ কোনো পেশাজীবী প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও সুন্দরবনে ভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। বনের মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর টানা তিন মাস বনাঞ্চলে সব ধরনের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে আসছে সরকার। তবে পাঁচ বছর পর এ সিদ্ধান্তে আংশিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, এবার থেকে নিষিদ্ধকালীন সময়েও 'করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র' পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, করমজল পশুর নদীর পাড়ে হওয়ায় মৎস্য, বন্যপ্রাণী বা বনাঞ্চলের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবেশগত গুরুত্ব

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, বনজীবীদের নৌযান চলাচল, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, পর্যটকবাহী ট্রলারের শব্দ এবং মানুষের উপস্থিতির কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তাই এই নিষেধাজ্ঞা বনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কোনো ধরনের পাস-পারমিট ইস্যু করা হবে না এবং কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে বন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বনজীবীদের দুর্ভোগ ও অভিযোগ

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বন বন্ধ রাখার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সুন্দরবন-নির্ভর হাজারো পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বন থেকে আহরণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আগামী তিন মাস পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন বনজীবীরা।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় বন বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে মহাজনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন তারা। এ সময় পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা না পাওয়ায় প্রতি বছরই নানামুখী সংকট ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয় বননির্ভর মানুষদের।

অনেক বনজীবী অভিযোগ করেন, বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা প্রায়ই 'ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ' থাকে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় এবং অসাধু বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের ঘুষ-বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর জেলেরা বনের অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করে। এছাড়া, মৎস্য সম্পদ বাড়ানোর জন্য সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিলেও বর্তমানে কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগের সামনেই বন সংলগ্ন ও বনের ভেতরের নদী-খালে অবৈধ নেটজাল দিয়ে নির্বিচারে মাছের পোনা নিধন করা হচ্ছে, যা বন্ধে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন জানান, সুন্দরবন উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবন। তবে গত এক দশকে সুন্দরবনের অর্থনীতির গতিপথ অনেকটাই বদলে গেছে, তাতে ভুক্তভোগী হচ্ছে বনজীবীরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে বনজসম্পদ আহরণসহ নানা উপায়ে বননির্ভরশীল মানুষের আয় কমেছে। মাছ-কাঁকড়া, মধু আহরণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

তিনি আরও বলেন, বন সুরক্ষায় স্থানীয় ও বনজীবীদের কার্যকর সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত হয়নি। যে কারণে জীবিকার তাগিদে বনজসম্পদ আহরণে তাদের কেউ কেউ অবৈধ ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেন। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে অপরাধ প্রবণতার পাশাপাশি বননির্ভরতা কমবেও। বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সুন্দরবনে 'প্রবেশনিষিদ্ধ' সময়ে সরকারিভাবে খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিসংখ্যান

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনের মোট আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৩১ শতাংশ জলভাগ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এ বনে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি জেলেনৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) সংগ্রহ করে। বন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে নিবন্ধিত বনজীবীর সংখ্যা ৫ হাজার ৮০০ জন এবং পশ্চিম বিভাগে ৬ হাজার ৩১০ জন। এছাড়া প্রতিবছর ২ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।