সিল্ক সিটি, মসলার উপকূল কিংবা নবাবের শহর—ভারতে বৈচিত্র্যময় নামের শহরের অভাব নেই। তবে কেরালার এরনাকুলাম জেলায় কোচিন থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে লুকিয়ে আছে এমন এক ছোট শহর, যার উপাধিটি অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি। ‘ভাজাকুলাম’ নামের এই শহরটিই ভারতের অবিসংবাদিত ‘আনারস রাজধানী’। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই ট্যাগ, বছরে শত শত কোটি রুপির ব্যবসা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কৃষকদের গৌরব নিয়ে এই শহরটি আজ ভারতের সবচেয়ে বড় আনারসের বাজার।
ভাজাকুলামের পরিচয়
ভাজাকুলামে পা রাখলেই বাতাসে ভেসে আসা পাকা আনারসের তীব্র মিষ্টি সুবাস জানান দেবে এর পরিচয়। এখানকার রাস্তাগুলোতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে আনারস বোঝাই লরি, আর প্রতিটি দোকানের বাইরে ঝোলে ‘আনারস ব্যবসা’র সাইনবোর্ড। পার্শ্ববর্তী ইডুক্কি জেলার থোডুপুঝার কাছে অবস্থিত এই শহরে আনারস চাষ কোনো খণ্ডকালীন কাজ নয়, বরং এটিই পুরো শহরের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। বর্তমানে প্রায় ৩৫০ জন কৃষক সরাসরি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় এই আনারসকে কেন্দ্র করে। ভরা মৌসুমে এই ছোট শহর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টন আনারস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে মুম্বাইয়ে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে একটি বড় অংশ চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে। এই সাধারণ শহরটি থেকে আনারস ব্যবসার বার্ষিক লেনদেন প্রায় ৮০০ কোটি রুপি!
ইতিহাস ও বিকাশ
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১৫৪৮ সালে পর্তুগিজরা ব্রাজিল থেকে ভারতে প্রথম আনারস নিয়ে আসে এবং ভাজাকুলামের উষ্ণ, আর্দ্র জলবায়ু ও সুনিষ্কাশিত মাটি এর জন্য একদম উপযুক্ত আবহাওয়া তৈরি করে। শুরুতে কেবল সীমানাপ্রাচীরের ফসল হিসেবে লাগানো হলেও ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে এটি স্থানীয় অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৯০-এর দশকে কৃষকেরা আনারস ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন এবং ১৯৯৫ সালে একটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক চাষাবাদ ও ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করে। ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আনারস চাষের সঙ্গে যুক্ত ব্লক পঞ্চায়েত সভাপতি জোস পেরুম্পালিকুন্নল জানান, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপের এই মেলবন্ধনে শিক্ষিত যুবকেরা আবার চাষাবাদে ফিরে এসেছেন, যা একে প্রধান জীবিকায় রূপান্তর করেছে।
কান্নারা আনারসের বৈশিষ্ট্য
ভাজাকুলামের ‘মরিশাস’ জাতের আনারস, যা স্থানীয়ভাবে ‘কান্নারা’ নামে পরিচিত, তার সুনির্দিষ্ট মোচাকৃতি, সোনালী-হলুদ রঙের শাঁস এবং অতুলনীয় সুবাসের জন্য বিখ্যাত। এর স্বাদ যেমন মিষ্টি, তেমনি এতে অম্লতার পরিমাণ (০.৫% থেকে ০.৭%) খুবই কম; পাশাপাশি এটি ক্যারোটিন, ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর। কোনো ভারী রাসায়নিক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এই আনারসগুলোর ওজন ১.৩ থেকে ১.৬ কেজি পর্যন্ত হয় এবং কাটার পরও সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত একদম তাজা থাকে। অন্য জাতের ১৮ মাস সময়ের তুলনায় কান্নারা জাতের আনারস মাত্র ৯ থেকে ১২ মাসেই পরিপক্ক হওয়ায় কৃষকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর অনন্য গুণের কারণে ২০০৯ সালে ভাজাকুলাম আনারস ‘জিআই ট্যাগ’ লাভ করে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে এর মর্যাদা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
এখানে আনারস কেবল একটি ফসল নয়, এটি হাজার হাজার মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। সেপ্টেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত চলা আনারসের ভরা মৌসুমে পুরো শহর যেন এক বাণিজ্য উৎসবে মেতে ওঠে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের রমজান মাসে যখন এর চাহিদা ও সরবরাহ থাকে তুঙ্গে। তখন আসাম থেকে আসা শ্রমিকেরা ফসল কাটার কাজে যোগ দেন এবং মাইলের পর মাইল লরির লাইন পড়ে যায়। ভাজাকুলামের গল্পটি মূলত একটি অঞ্চলের সঙ্গে একটি ফলের নিবিড় ভালোবাসার গল্প।



