নদীর পাড়ে জমি কিনে যে কেউ স্থাপনা গড়তে পারে: নদী রক্ষায় নতুন চিন্তা
নদীর পাড়ে জমি কিনে যে কেউ স্থাপনা গড়তে পারে

নদীর পাড়ে জমি কিনে যে কেউ এ দেশে যেকোনো স্থাপনা গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু নদীশাসনের অধিকার কি তার আছে? এতিমের যেমন অভিভাবকের অভাব হয় না, তেমনি বাংলাদেশে নদীর অভিভাবক সবাই। কলকারখানার মালিকদের নিজ উদ্যোগে পাড় ঢালাই বা পাড় বাঁধাইয়ের কাজ পঞ্চগড়ের ডাহুক, সিরাজগঞ্জের যমুনা, পাকশীর পদ্মা বা গড়াই—সর্বত্র চলছে ইচ্ছেমতো। এদের রোখার কেউ নেই।

নদী কেন মরে যায়?

কেন মরে যায় নদী? এই প্রশ্নের সহজ কিন্তু গভীর বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ‘চিত্রা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কেন মরে গেল নদী।/ আমি বাঁধ বাঁধি তারে চাহি ধরিবারে/ পাইবারে নিরবধি,/ তাই মরে গেল নদী।’ এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করার চেয়ে বেশি টেকসই।’

নদীর আইনি অধিকার

বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০১৯ সালে ঘোষিত এক রায়ে তুরাগ নদসহ দেশের সব নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর অর্থ, নদ–নদীগুলোর মানুষের মতো আইনি অধিকার ও সুরক্ষা রয়েছে। এই রায় অনুসারে, নদী দখল বা দূষণ করলে তা মানুষের ওপর হামলার মতোই আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং নদী নিজের পক্ষে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে। জীবন্ত সত্তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নদী বলতে শুধু পানির ধারা নয়; বরং এর পাড়, তলদেশ ও বাস্তুতন্ত্র—সবকিছুকেই বোঝানো হয়েছে। নদী একটি জীবিত প্রাণী বা সত্তার মতো অনুভব করতে সক্ষম এবং এর বয়ে চলার নিজস্ব অধিকার রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাব্রিস মানসিকতা

এত সবের পরও নদীকে গ্রাহ্যের মধ্যে নিতে চান না নদী ব্যবস্থাপকেরা। পরিবেশবাদী আর নদীর পক্ষের মানুষেরা এটাকে বলছেন ‘হাব্রিস’ মানসিকতা। প্রাচীন গ্রিসে হাব্রিস শব্দটি শুধু অহংকার বোঝাত না; এটি এমন একধরনের চরম ঔদ্ধত্য বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসকে নির্দেশ করত, যা একজন মানুষকে নৈতিক আইন, সামাজিক নিয়ম, এমনকি দেবতাদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে প্ররোচিত করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নদীর পাড় ঢালাইয়ের বিপদ

সম্প্রতি কৃষি উদ্যোক্তা দেলওয়ার জাহান মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর পাড় ঢালাইয়ের ছবি ফেসবুকে দিয়ে এসব নদীবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘নদীর পাড়গুলো প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর, নানা গাছ–লতাপাতা, বিভিন্ন জায়গা থেকে নদীর পানিতে ভেসে আসা বীজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল। জলের ইকোলজিতে নদীর পাড় গুরুত্বপূর্ণ। নদীর পাড়গুলো যেখানে জল ও স্থলের সংযোগস্থল, সেটিকে ইকোলজিতে ইকোটন বলে। এখানে জগতের সবচেয়ে বেশি প্রাণবৈচিত্র্য বায়োডাইভারসিটিতে সমৃদ্ধ থাকে। এই সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনার জায়গাগুলো ঢালাই করে সিমেন্টে বেঁধে দেওয়া বা ব্লক ফেলা—সবকিছুই নিতান্ত অনাচার।’

ভারতের প্রকৌশলী জি ডি আগরওয়ালের সংগ্রাম

প্রকৌশলী মানেই ‘হাব্রিস’ নয়। ভারতের প্রকৌশলী জি ডি আগরওয়ালের নাম আমরা জানি। নদীর প্রশান্তি ও অবিরাম প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে ১১১ দিনের দীর্ঘ অনশন শেষে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর তিনি মারা যান। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বহতা নদীতে এক বিশেষ ধরনের ‘ব্যাকটেরিওফাজ’ নামের ভাইরাস থাকে, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে পানির শুদ্ধতা বজায় রাখে। নদীর পাড়ে দেওয়া একের পর এক বাঁধ দিয়ে নদীকে আটকে স্থির করা হলে ভাইরাসগুলো মারা যায় এবং নদীর প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী গুণ নষ্ট হয়ে যায়।

পরিবেশবান্ধব সমাধান: ভেটিভার ঘাস

আমাদের কোনো জি ডি আগরওয়াল নেই, কিন্তু নদীকে না মেরে পাড় রক্ষার বিকল্প উপায়ের সন্ধানে আছেন অনেকে। বাংলাদেশের নদীগুলোতে তীব্র স্রোত, বন্যা ও মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে নদীতীর ভাঙন একটি বড় সমস্যা। প্রচলিত কংক্রিট বা পাথরের বাঁধ অনেক সময় ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এর বিপরীতে ভেটিভার ঘাস একটি গভীর মূলবিশিষ্ট উদ্ভিদ, যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি স্থিতিশীল করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই সমাধান দেয়। ভেটিভার ঘাসভিত্তিক নদীতীর সংরক্ষণ এখন শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিজিসহ বহু দেশে বাস্তব ও সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে এবং টেকসই সমাধান হিসেবে প্রমাণিত। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে নদীর বাঁধ বারবার ভেঙে যাওয়ার সমস্যার সমাধানে এই ঘাস ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি পাইলট প্রকল্পে প্রায় ২০০ মিটার বাঁধে ৩ হাজার ৩৫০টি ভেটিভার ঘাস লাগানো ফলে মাটির ক্ষয় কমেছে, বাঁধের স্থায়িত্ব বেড়েছে। এখন স্থানীয়ভাবে বড় আকারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীর পাড় ভাঙন রোধে পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলো এমন হওয়া উচিত, যাতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই সমাধান পাওয়া যায়।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক। মতামত লেখকের নিজস্ব।