একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তাহার কর্মক্ষম মানুষের হাতে নিহিত থাকে। যেই রাষ্ট্র তাহার নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিতে পারে, সেই রাষ্ট্রের ভিত দৃঢ় হয়। আর যেই রাষ্ট্রে ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হইতে থাকে, সেইখানে অস্থিরতা, হতাশা ও সামাজিক চাপ নীরবে জন্ম লইতে থাকে। কারণ, বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নহে-ইহা রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক সংকটেরও উৎস। গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রধান প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গত তিন বৎসরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হইয়াছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বলিতে যাহাকে বোঝানো হয়, সেই তৈরি পোশাক খাত আজ নানা চাপে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত হইতে। অর্থাৎ, এই শিল্প কেবল একটি ব্যবসায় নহে-ইহা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শিরা-উপশিরার সহিত সংযুক্ত। সেই খাত যখন সংকুচিত হইতে থাকে, তখন তাহার অভিঘাত ব্যাংক, পরিবহন, আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়-সর্বত্র অনুভূত হয়। সুতরাং একটি কারখানা বন্ধ মানে কেবল কিছু মেশিন থামিয়া যাওয়া নহে-ইহা বহু পরিবারের রান্নাঘরের আগুন নিভিয়া যাইবার সমতুল্য।
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ
যদিও সংকটের কারণ বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমিতেছে, ক্রেতারা কম মূল্যে পণ্য কিনিবার চাপ দিতেছে, অন্যদিকে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়িতেছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ডিজেল, পরিবহন-প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ব্যয় বৃদ্ধি পাইয়াছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার শিল্পকে শ্বাসরুদ্ধ করিতেছে। ডলারের অস্থিরতা ব্যাবসায়িক পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করিয়া তুলিতেছে। আবার শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাইয়াছে, যাহা মানবিক ও ন্যায্য হইলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করিয়াছে। অর্থাৎ, উদ্যোক্তা ও শ্রমিক-উভয়েই এক প্রকার চাপের বৃত্তে আবদ্ধ।
প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রতিযোগিতার চাপ
ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে প্রশাসনিক জটিলতা। পোশাকশিল্প মূলত সময়নির্ভর ব্যবসায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য চাহিয়া থাকে; কিন্তু কাস্টমস জটিলতা, বন্ড সুবিধার বিলম্ব, এইচএস কোড সংযোজনের দীর্ঘসূত্রতা এবং কাঁচামাল খালাসে বাধা-সকল মিলাইয়া 'লিড টাইম' ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত বিমানভাড়া বা ডেমারেজ চার্জ বহন করিতে হইতেছে। ব্যবসায় তখন আর প্রতিযোগিতার উপর নির্ভর করে না, বরং টিকিয়া থাকিবার সংগ্রামে পরিণত হয়। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা চীন নিজেদের রপ্তানিকারকদের নানামুখী প্রণোদনা ও করসুবিধা প্রদান করিতেছে। সেইখানে বাংলাদেশ যদি কেবল কর বৃদ্ধি, জটিলতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহা হইলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছাইয়া পড়া অবশ্যম্ভাবী।
সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তা
শিল্পনীতি কখনো কেবল রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিকোণ হইতে পরিচালিত হইতে পারে না-ইহা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সহিত যুক্ত। শিল্প টিকিয়া থাকিলেই শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়া থাকে। আবার শ্রমিকের ন্যায্য জীবনমান নিশ্চিত না হইলে শিল্পের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়। অতএব, প্রয়োজন এমন নীতির, যাহা শিল্পকে টিকাইয়া রাখিবে এবং শ্রমিকের মর্যাদাকেও সুরক্ষিত করিবে। মনে রাখা প্রয়োজন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্যও বটে। কারণ, কর্মহীন মানুষের হতাশা একসময় সমাজের অস্থিরতায় রূপান্তরিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেই সমাজে তরুণেরা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে, সেই সমাজে অপরাধ, উগ্রতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সুতরাং পোশাকশিল্প রক্ষা মানে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা নহে-ইহা সামাজিক স্থিতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কবচ।
জরুরি পদক্ষেপসমূহ
সুতরাং সরকারের নিকট এখন জরুরি দায়িত্ব হইল-দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতি সহায়তা প্রদান করা। কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করা, কাস্টমস ও বন্ড প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাইবার উপযোগী জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা। শিল্পের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পরিবেশ।



