সঞ্চয়পত্রের মুনাফার কর ফেরত পেতে রিটার্ন বাধ্যতামূলক
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার কর ফেরত পেতে রিটার্ন বাধ্যতামূলক

আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অগ্রিম কর ফেরত পাওয়া যাবে না। যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, তাঁরাও এখন অগ্রিম করের টাকা ফেরত পেতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিতে বাধ্য হবেন। অন্যদিকে, শহর এলাকায় জমি-ফ্ল্যাট বণ্টন ও মিউটেশন (নামজারি) করতে হলে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র ছাড়া এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে না।

সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ

সুখবর হলো, আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছরই আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে। আর আগেভাগে রিটার্ন দিলে করদাতারা করছাড় সুবিধাও পাবেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন, যেখানে কর খাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে করদাতাদের ওপর চাপ বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা মিলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, বাজেটে আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় সহজীকরণ করা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তাঁর মতে, যেকোনো সংস্কারই কারও কারও জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এবারের বাজেটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে, কারণ তাঁদের রিটার্ন দিয়ে অগ্রিম করের টাকা ফেরত নিতে হবে। ব্যাংক হিসাব খুলতেও টিআইএন লাগবে, যা আরও চাপ বাড়াবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেলিম রায়হান আরও বলেন, আয়কর খাতে এমন সংস্কারের ফলে করদাতাদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেদিকে মাঠপর্যায়ে নজর রাখতে হবে। করদাতাদের আস্থায় আনতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জমি-ফ্ল্যাট নামজারিতে রিটার্ন বাধ্যতামূলক

নতুন বাজেটে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের জন্য শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, জমি-ফ্ল্যাট বণ্টন ও মিউটেশন (নামজারি) করতে হলে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই পরিবর্তনের প্রস্তাব অর্থবিলের মাধ্যমে বাজেটে আনে। এর ফলে ফ্ল্যাট ও জমির মালিকদের মালিকানা নিতে আয়কর রিটার্ন দেওয়ার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক হবে। বর্তমানে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি, লিজ, হস্তান্তর বা বায়নানামা নিবন্ধনেও আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র লাগে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, শহর এলাকায় যাঁরা জমি ও ফ্ল্যাট কেনেন, তাঁদের করযোগ্য আয় আছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক বেশি, যা করমুক্ত আয়সীমার নিচে থাকা মানুষের পক্ষে কেনা প্রায় অসম্ভব।

ইউপি চেয়ারম্যান হতেও রিটার্ন বাধ্যতামূলক

এখন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হতে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দেওয়ার প্রমাণপত্র (পিএসআর) দেখাতে হবে। রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র ছাড়া নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থীদের আগে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে তা সংযুক্ত করতে হবে।

এছাড়া, এখন থেকে শুধু নিবাসী করদাতা কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হতে হলে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। অনিবাসী পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এই শর্ত প্রযোজ্য নয়।

৩৯ ধরনের সেবায় রিটার্নের প্রমাণপত্র

বর্তমানে ৩৯ ধরনের সেবায় রিটার্নের প্রমাণপত্র লাগে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণে; সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে; চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি, আইনজীবী ও কর আইনজীবী, একচুয়ারি, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ার হিসেবে কোনো স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদ নবায়নে; সিটি করপোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস-বিদ্যুৎ-সংযোগ প্রাপ্তিতে; ১০ লাখের অধিক টাকার সঞ্চয়পত্র কেনায়; দ্বিচক্র বা ত্রিচক্র মোটরযান ছাড়া অন্য মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়নকালে; হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহের লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নে।

সঞ্চয়পত্রে কর ফেরত পেতে রিটার্ন

এবারের বাজেটের প্রস্তাব অনুসারে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়, তা আর চূড়ান্ত কর দায় নয়। বছর শেষে তা সমন্বয় করা যাবে। যদি কোনো করদাতার প্রযোজ্য করের চেয়ে বেশি কর কেটে রাখা হয়, তাহলে তা ফেরত পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন করদাতার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বছরজুড়ে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হলো। কিন্তু বছর শেষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় দেখা গেল, নানা ছাড়ের পর তাঁর বার্ষিক করের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা। তাহলে তিনি বাকি ১০ হাজার টাকা ফেরত পাবেন। তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অগ্রিম কর ফেরত পেতে অবশ্যই ওই করদাতাকে রিটার্ন দিতে হবে।

বর্তমান নিয়ম অনুসারে, ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে টিআইএন লাগে। তাই ছোট ছোট সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী কিন্তু যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, এমন ব্যক্তিদের এখন টিআইএন নিয়ে বছর শেষে রিটার্ন দিয়ে সঞ্চয়পত্রের কেটে রাখা অগ্রিম করের টাকা ফেরত নিতে হবে। রিটার্ন জমার সময় ব্যাংক হিসাব নম্বর জানিয়ে টাকা ফেরতের দাবি করতে হবে। কর কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করে ১২০ দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে প্রাপ্য টাকা ফেরত দেবেন।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এ ধরনের করদাতারা টিআইএন ছাড়াই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন। দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক সদস্য টিআইএন ছাড়াই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, করযোগ্য আয় নেই—এমন বিবেচনায়। তাঁদের এখন অগ্রিম করের টাকা ফেরত পেতে টিআইএন নিয়ে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী অনেক করদাতা করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন জমা দেন। তাঁরা এই নতুন নিয়মের সুবিধা পাবেন, কারণ এত দিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর যে কর কেটে রাখা হতো, তা চূড়ান্ত কর দায় ছিল, যা ফেরত পাওয়া যেত না। এখন তাঁরা সেই টাকা ফেরত পাবেন।

বর্তমান আয়কর আইন অনুসারে, সঞ্চয়পত্রের ওপর অগ্রিম কর ১০ শতাংশ। তবে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ২০১৯ সাল থেকে পেনশনার সঞ্চয়পত্র ছাড়া পরিবার সঞ্চয়পত্রসহ বাকি তিনটি সঞ্চয়পত্রের (৫ লাখ টাকা পর্যন্ত) মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর কেটে রাখে। কোন হারে অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় দেখা গেছে। বেশ কয়েকজন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীর জুন মাসের মুনাফার টাকা এখনো পাননি বলে জানিয়েছেন।

বিনিয়োগে করসুবিধা কমল

এবারের বাজেটে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত সুবিধা কমানো হয়েছে। আগে করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ কিংবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হতো, তা-ই রেয়াতের পরিমাণ ছিল। নতুন নিয়মে তা করা হয়েছে করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ কিংবা সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হবে, তা-ই রেয়াতের পরিমাণ। এর ফলে বড় করদাতারা বিনিয়োগ করে আগের মতো কর ছাড় পাবেন না। হিসাব করে দেখা গেছে, একজন করদাতার যদি বছরে ৩ কোটি টাকা করযোগ্য আয় থাকে এবং তিনি ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে নতুন নিয়ম অনুসারে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত আড়াই লাখ টাকা কমবে। আগের হিসাবে তিনি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত সুবিধা পেতেন, এখন পাবেন সাড়ে ৭ লাখ টাকা।

আগে রিটার্ন দিলে করছাড়

আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর রিটার্ন দেওয়া যাবে এবং আগে দিলে বেশি করছাড় পাবেন করদাতারা। বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যা কম তা-ই ছাড় পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন দিলে কোনো প্রণোদনা পাওয়া যাবে না, শুধু কর দিতে হবে। তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে। আর চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে।