অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সোমবার সংসদে জানিয়েছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহ প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। তিনি এটিকে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন।
রাজস্ব খাতে অগ্রগতি ও ভ্যাট প্রসঙ্গ
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব খাতে এই গতি এসেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করতে ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনা করে কাঁচাবাজার ও ছোট মুদি দোকানকে এই ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হবে।
ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল
চৌধুরী ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ধারায় বলা ছিল, কোনো ব্যাংক রেজুলেশনের আগে যারা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে পরবর্তীতে পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছা করলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারত। এই ধারা সংযোজনের পর বিতর্ক সৃষ্টি হয়; বিরোধী দলগুলো বলেছিল, এই ধারা এস আলমের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্ত করা হয়েছে।
শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত
পাঁচটি একীভূত শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের রোডম্যাপ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়া হবে। ক্যান্সার ও কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, হজ সেভার্স এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে সংশোধনী
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থমন্ত্রী অর্থবিলে কয়েকটি সংশোধনীর ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রয়েছে জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ছাড়, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন সম্পন্নকারী কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর সুবিধা এবং লভ্যাংশের ওপর করহার কমানোর প্রস্তাব। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে কর ছাড়ের জন্য ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের সীমা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সম্পদ জব্দ ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, মে মাস পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট' পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথম ধাপে ছয়টি প্রধান ঋণগ্রহীতা গ্রুপের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, কৃষি ও শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং অসাধু চক্রের কৃত্রিম সংকট ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য আনুমানিক ৬.৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প, কৃষি ও আইসিটিসেবা খাত সম্প্রসারণ এবং সব সম্ভাবনাময় খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি সেক্টরকে মূলধারায় এনে সারা দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা হবে, যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।



