তামাক কর নীতিতে শুধু হার নয়, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি
বাংলাদেশে তামাক পণ্যের ওপর কর আরোপ বহু বছর ধরেই সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে তামাক খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব এসেছে, যা মোট কর আদায়ের প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু একইসঙ্গে তামাকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও ক্রমেই সামনে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে– শুধু কর বাড়ানোই কি যথেষ্ট, নাকি কর কাঠামোতেই পরিবর্তন আনা দরকার?
বর্তমান কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে বাংলাদেশে তামাক পণ্যের ওপর মূলত অ্যাড-ভ্যালোরেম কর ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে কর নির্ধারণ করা হয় পণ্যের মূল্যের শতকরা হারে। এই ব্যবস্থায় সিগারেটের দাম বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করের পরিমাণও বাড়ে। তাত্ত্বিকভাবে এটি রাজস্ব বাড়াতে সাহায্য করার কথা থাকলেও বাস্তবে এতে বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে জটিল কর কাঠামোর কারণে বাজারে ‘ডাউনট্রেডিং’– অর্থাৎ কম দামের ব্র্যান্ডে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা একদিকে জনস্বাস্থ্য নীতির লক্ষ্যকে দুর্বল করে এবং অন্যদিকে সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্ব বৃদ্ধিও সীমিত করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও ভয়ঙ্কর। আকস্মিক কর বৃদ্ধি এবং মূল্যবৃদ্ধির ফলে অনেক ক্রেতা ডাউনট্রেড করে বৈধ পণ্য থেকে সরে গিয়ে সরাসরি কম দামের অবৈধ পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অথচ বাংলাদেশে তামাকের ওপর করের হার বিশ্বে সর্বোচ্চগুলোর একটি, যা পণ্যের মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার পণ্য বিক্রিতে কোম্পানিগুলোকে সরকারকে ৮৩ শতাংশ রাজস্ব প্রদান করতে হয়।
নির্দিষ্ট কর কাঠামোর সুবিধা
সম্প্রতি পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি বর্তমান অ্যাড-ভ্যালোরেম ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ভিত্তিক কর চালু করা হয়– যেখানে প্রতি ইউনিট পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ কর আরোপ করা হবে, তাহলে আগামী ১০ বছরে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির অতিরিক্ত প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। একইসঙ্গে এই পরিবর্তনের ফলে তামাক ব্যবহারের হার প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলেও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর কাঠামোর সংস্কার নিয়ে সাম্প্রতিক একটি আলোচনাতেও একই ধরনের সুপারিশ উঠে এসেছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রকাশিত এক নীতি বিশ্লেষণে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য করার জন্য আধুনিক এক্সাইজ কর কাঠামো চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের কর কাঠামো চালু করলে তামাক খাত থেকে রাজস্ব বেশি আয় হবে এবং পুরো রাজস্ব ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
আন্তর্জাতিক পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা
তামাক কর কাঠামোর সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। সরকারের ঘোষিত ইশতেহারে তামাক কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও আধুনিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আরো আগেই উল্লেখ করেছে যে, তামাক কর নীতি পরিকল্পনায় কর কাঠামোর সরলতা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ, যা রাজস্ব সংগ্রহকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। অনেক দেশ ধীরে ধীরে অ্যাড-ভ্যালোরেম ব্যবস্থা থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট কর বা মিশ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, কারণ এতে কর প্রশাসনিক কাজ সহজ হয় এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমে। বিশেষ করে যেখানে বাজারে বিভিন্ন মূল্যস্তরের পণ্য রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা পণ্যের দামের কৃত্রিম বৈষম্য ও কর কাঠামোর ফাঁকফোকর কমাতে সাহায্য করে।
অবৈধ বাণিজ্য ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের বৃদ্ধি। গত কয়েক বছরে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ– যেমন বারবার মূল্যবৃদ্ধি বা কঠোর নীতিমালা– কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ বাণিজ্যের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। যখন বৈধ পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ে কিন্তু কর কাঠামো জটিল থাকে, তখন অবৈধ বা কম করযুক্ত বিকল্পের দিকে বাজার সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতির লক্ষ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি সরল, নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা– যেখানে প্রতি ইউনিটে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর আরোপ করা হবে– তা বাজারে স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে এবং অবৈধ বাণিজ্যের প্রণোদনাও কমাতে পারে। কর নীতির এই বোধগম্যতার অভাব নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন তুলেছে ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। তারা বলেছে, কর নীতি এত জটিল যে একজন স্থানীয় ব্যবসায়ীও তা সহজে বুঝতে পারেন না– বিদেশি বিনিয়োগকারী কিভাবে বুঝবেন?
সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন
অবশ্য তামাক কর সংস্কারকে কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। জনস্বাস্থ্য গবেষণা বলছে, তামাক ব্যবহারের সামাজিক ক্ষতি অত্যন্ত বড়। এই বাস্তবতায় তামাক কর নীতিকে এমনভাবে নকশা করা প্রয়োজন যাতে এটি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাজস্ব স্থিতিশীলতা– উভয় লক্ষ্য পূরণ করতে পারে। শুধু করের হার নয়, বরং কর কাঠামোকে সরল, পূর্বানুমানযোগ্য এবং কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ যখন তার সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করে তোলার পথে এগোতে চায়, তখন তামাক কর কাঠামোর সংস্কার সেই বৃহত্তর সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। সঠিক নীতি নকশা থাকলে এটি একদিকে ধূমপান কমাতে সহায়তা করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণও আরও টেকসই ও কার্যকর করে তুলবে।
