বাংলাদেশের ভ্যাট সংস্কার: প্রকৃত সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান
বাংলাদেশে ভ্যাট সংস্কার নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা ও উদ্যোগ চললেও, দেশের কর-জিডিপি হার এখনও বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, গৃহীত সংস্কার পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভ্যাট ব্যবস্থায় কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বেশি কথা বলা হয়, অথচ অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
ভ্যাট হার নিয়ে বিভ্রান্তি: একক হার বনাম বহু হার
বর্তমানে বাংলাদেশে ভ্যাট হার ১০টি স্তরে বিভক্ত, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ হার প্রধানত প্রযোজ্য। হ্রাসকৃত হারগুলো সীমিত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও কিছু অর্থনীতিবিদ একক ভ্যাট হার প্রবর্তনের পক্ষে কথা বললেও, এটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে ৭০টিতেই হ্রাসকৃত ভ্যাট হার বিদ্যমান, যা প্রমাণ করে যে বহু হার ব্যবস্থা একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতা: হ্রাসকৃত হারেই লাভ বেশি
মজার বিষয় হলো, ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের তুলনায় হ্রাসকৃত হারে সরকার বেশি রাজস্ব পায়। কারণ, ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রদানকারীরা উপকরণ কর রেয়াত পায়, যা প্রকৃত ভ্যাট প্রদানকে ৩-৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে, হ্রাসকৃত হার যেমন ৫, ৭.৫ বা ১০ শতাংশে ভ্যাট প্রদানকারীরা কোনো রেয়াত পায় না, ফলে সরকার সরাসরি সম্পূর্ণ হারেই রাজস্ব আদায় করতে পারে।
মূল সমস্যা: বিক্রির তথ্য গোপন ও ভ্যাট ফাঁকি
ভ্যাট সংস্কারের আসল চ্যালেঞ্জ হলো হার নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং বিক্রেতাদের দ্বারা বিক্রির তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ রেকর্ড করে না, যার ফলে ভ্যাট আদায় ব্যাহত হয়। সিএ অডিট রিপোর্ট ও ভ্যাট দাখিলপত্রের মধ্যে পার্থক্যই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
ইনভয়েস অটোমেশন: ভ্যাট সংস্কারের মূল চাবিকাঠিবাংলাদেশে ভ্যাট সংস্কারের কেন্দ্রীয় ফোকাস হওয়া উচিত ইনভয়েস অটোমেশন বাস্তবায়ন। ভ্যাটযোগ্য ও অযোগ্য সব ধরনের বিক্রির ইনভয়েস স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জারি করে সার্ভারে সংরক্ষণ করলে, ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা সম্ভব। এটি শুধু ভ্যাট আদায়ই নয়, আয়কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনায়ও বিপ্লব আনতে পারে।
লেখক: মো. আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম ও ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।