দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে এবার ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) পৌঁছে দিতে চাওয়া হচ্ছে গ্রাম পর্যন্ত। লক্ষ্য— দেশের বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং দীর্ঘদিনের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো।
টোকেন ভ্যাট: সহজ প্রবেশ নাকি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি?
এনবিআরের পরিকল্পনায় রয়েছে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার একটি ‘টোকেন ভ্যাট’ চালু করা। মূল উদ্দেশ্য— ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর প্রদানে অভ্যস্ত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। কিন্তু এই প্রস্তাব অনেকের কাছে পুরোনো ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে। অতীতে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-ব্যবসায়ী যোগসাজশের কারণে সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল। ফলে নতুন করে একই ধরনের কাঠামো চালু হলে সুশাসন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিআইএন বাধ্যতামূলক: কর জালে আনতে নতুন হাতিয়ার
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে— ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও ট্রেড লাইসেন্স পেতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা। এর মাধ্যমে কর প্রশাসন সরাসরি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন থাকলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দেয়— মাত্র ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। অথচ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে প্রায় ১.১৭ কোটি, যার ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং এর বড় অংশ গ্রামে অবস্থিত। এই বাস্তবতায় এনবিআর মনে করছে, করের আওতা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যেই।
কর-জিডিপি অনুপাত: দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্তও রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু কর অব্যাহতি কমালেই হবে না— করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গা থেকেই গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ।
ব্যবসায়ীদের সমর্থন, তবে সতর্কতার আহ্বান
নীতিগতভাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অল্প অঙ্কের ভ্যাট সংগ্রহ সম্ভব হলেও সেটি যেন হয় স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত। তার মতে, “কর আদায়ের নামে অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক খরচ বা হয়রানি তৈরি হলে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হতে পারে।” একইভাবে ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, হঠাৎ করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স নবায়নেই নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
রাজস্বের ভৌগোলিক বৈষম্য: ঢাকার বাইরে বিশাল সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামে হলেও, রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই দুই অঞ্চল থেকে। অর্থাৎ দেশের বড় একটি অংশ এখনও কার্যত করের বাইরে। এই বৈষম্য কমাতে গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণ কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা বলছেন, এটি ধাপে ধাপে ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বাস্তবতা: তথ্য ঘাটতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা
এই পরিকল্পনার বড় বাধা হতে পারে তথ্যের অভাব। দেশের ব্যাংকিং খাতে ১৭ কোটির বেশি হিসাব থাকলেও কতগুলো ব্যবসায়িক হিসাব— তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। একইভাবে ট্রেড লাইসেন্সধারী সক্রিয় ব্যবসার সংখ্যাও স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাটের আওতা বাড়াতে গেলে আগে একটি নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুযোগ বনাম ঝুঁকি
গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থায় আনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। এতে রাজস্ব বাড়বে, অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণ হবে এবং নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারবে। তবে বাস্তবায়নে যদি অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হয়, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি বাড়ে, বা ছোট ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হয়— তাহলে এর উল্টো প্রভাবও পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআরের এই উদ্যোগ আসলে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। এটি সফল করতে হলে প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ। অন্যথায়, রাজস্ব বাড়ানোর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে গিয়ে নতুন জটিলতার জন্ম দিতে পারে।



