বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিগত সরকারের সম্পাদিত চুক্তিতে ‘সভরেইন গ্যারান্টি’ বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা যুক্ত থাকায় এসব চুক্তি চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান।
চুক্তি বাতিলের জটিলতা ও দর-কষাকষি
সংরক্ষিত আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যে চুক্তি করেছিল, সেখানে ‘সভরেইন গ্যারান্টি’ দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া এক ধরনের নিশ্চয়তা, যা বাতিল করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। তবে এসব কোম্পানির সঙ্গে বিলম্ব পরিশোধ ফি (লেট পেমেন্ট ফি) মওকুফসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ আলোচনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দাম কমানোর প্রচেষ্টা
মন্ত্রী আরও বলেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে প্রবেশ করার পর গোটা সিস্টেম সচল রাখার স্বার্থে হুট করে জোড়াতালি দেওয়া কিংবা শক্ত অবস্থানে দর-কষাকষি করা যায় না। ফলে যতদিন পর্যন্ত এসব চুক্তি বলবৎ থাকবে, ততদিন সরকার বিদ্যুতের দাম কমিয়ে সহজ মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা
জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে কোনো কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু নেই এবং সেগুলোর সঙ্গে কোনো চুক্তিও বহাল নেই। ফলে এই খাতে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জও পরিশোধ করতে হচ্ছে না। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ দুটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ শর্তে নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে, যেগুলো এখন সচল রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি
ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেনের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই বিপুল ঘাটতির কারণে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না, যা বিতরণ ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লস
যশোর-৪ আসনের গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতের সঞ্চালন লস ছিল ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং বিতরণ লস ছিল ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চালন লস সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ হলেও বিতরণ লস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
জ্বালানি তেলের দাম ও বিপিসির লোকসান
রংপুর-৩ আসনের মাহবুবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করলেও তা এখনো ব্রেক-ইভেন পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে। এ কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে দৈনিক ৭৮ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত সময়ে বিপিসির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও কমে সহনীয় পর্যায়ে এলে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে দেশের বাজারেও তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশেষ আইনে চুক্তি পর্যালোচনা
সংরক্ষিত আসনের সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ এর আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত দুটি কমিটি ইতোমধ্যে পৃথক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে বর্তমানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।



