আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করলেও দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান গুনছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি তেলের এলসি পরিশোধের হিসাবে বিপিসির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আবদুল খালেকের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে লিখিত প্রশ্নোত্তর উপস্থাপন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশীয় মূল্য সমন্বয়
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত মে মাস থেকে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করলেও তা এখনো পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় বেশি রয়েছে। ফলে দেশের বাজারে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বিপিসিকে লোকসান বহন করতে হচ্ছে। তিনি জানান, জুন মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ছিল ১৭৫ দশমিক ২২ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ছিল ১৬০ দশমিক ৭০ টাকা। জনস্বার্থে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
তিন মাস ধরে নিজস্ব তহবিলে আমদানি
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে বিক্রি করলেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে টানা তিন মাস জ্বালানি তেল আমদানি কার্যক্রম সচল রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও সহনশীল পর্যায়ে এলে দেশের বাজারেও মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নতুন গ্যাস সংযোগ স্থগিত
সংসদে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, এলপিজি সহজলভ্য হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে আপাতত সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজি যুক্ত হওয়ার পরও সরবরাহ ঘাটতি থাকায় ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে শুধু বিদ্যুৎ, সার ও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলে নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশের সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন
মন্ত্রী আরও জানান, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত গড় সরবরাহ হয়েছে দৈনিক ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশে ১৩৭টি গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে বলে জানান তিনি। মে মাস পর্যন্ত এসব কেন্দ্রের মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট, যা দেশের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
বিপিসির অডিট আপত্তি ও প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব
এদিকে, বিপিসি ও এর অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মে মাস পর্যন্ত ১ হাজার ৪০৯টি অডিট আপত্তি রয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা বলেও সংসদকে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অডিট অধিদপ্তর ঢাকায় থাকলেও বিপিসির প্রধান কার্যালয় অন্যত্র হওয়ায় তথ্য আদান-প্রদানে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে অডিট কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে এবং অনিয়ম প্রতিরোধ সহজ হবে।



