জ্বালানি সংকটে বন্ধ সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ নৌপথের স্পিডবোট, যাত্রী ও কর্মীদের দুর্ভোগ
জ্বালানি সংকটে সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ স্পিডবোট বন্ধ, যাত্রী দুর্ভোগ

জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ নৌপথের স্পিডবোট চলাচল

অকটেনের তীব্র সংকটের কারণে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাট পর্যন্ত নৌপথে স্পিডবোটের যাত্রী পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংকটের ফলে সন্দ্বীপগামী যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন, পাশাপাশি চালক, সহকারী, টিকিট মাস্টার ও লাইনম্যানসহ প্রায় দেড় শতাধিক কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

ঘাটে নীরবতা, যাত্রীদের হতাশা

সীতাকুণ্ডের কুমিরা ঘাট ও সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ স্পিডবোট খালের তীরে বা শুকনো জায়গায় সারিবদ্ধভাবে তুলে রাখা হয়েছে। ইঞ্জিন বন্ধ থাকায় এসব বোট নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। ঘাটের দোকান ও টিকিট কাউন্টারের সামনে চালক ও তাদের সহকারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে যাত্রীরা এসে স্পিডবোট চলাচলের খোঁজ নিলেও জ্বালানি সংকটের কথা শুনে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

সন্দ্বীপগামী যাত্রী ইসমাইল হোসেন বলেন, "জরুরি কাজে সন্দ্বীপ যেতে হবে, কিন্তু ঘাটে এসে জানলাম স্পিডবোট বন্ধ। এতে আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছি।" কাউন্টার থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, জোয়ারের সময় কাঠের ট্রলার ছাড়তে পারে, কিন্তু তা অনিশ্চিত।

কর্মীদের বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট

স্পিডবোট চালকের সহকারী নাজমুল আলম বলেন, "প্রতিদিন সকালে কাজের আশায় ঘাটে আসি, কিন্তু অকটেন না থাকার খবর শুনে সারা দিন বসে থাকতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে কী করব, বুঝতে পারছি না।" স্পিডবোটচালক বিশু দাস জানান, আট দিন ধরে তাদের বোট বন্ধ রয়েছে। যাত্রীরা চাপ দিলেও জ্বালানি সংকটের কারণে কিছুই করা যাচ্ছে না, যা মাঝেমধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করছে।

আরকে এন্টারপ্রাইজের মালিক জগলুল হোসেন বলেন, "চালক, সহকারী, টিকিট মাস্টার, লাইনম্যান—সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় ১৫০ জন কর্মী রয়েছেন। স্পিডবোট বন্ধ থাকায় তাঁরা কাজ করতে পারছেন না, কিন্তু বেতন দিতে হচ্ছে। আয় নেই, অথচ ঘাটের ইজারাও দিতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক চাপ।"

নৌপথের বর্তমান অবস্থা ও চাহিদা

কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌপথে মূলত তিনটি কোম্পানি স্পিডবোট পরিচালনা করে:

  • আদিল এন্টারপ্রাইজ ও আরকে এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে স্পিডবোট সার্ভিস চালায়।
  • সন্দ্বীপ মেরিন সার্ভিস যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে।

বর্তমানে এই নৌপথে ২৫টি স্পিডবোট যাত্রী পরিবহন করে, যাদের দৈনিক অকটেনের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ে প্রায় তিন হাজার লিটার। ঈদের সময় যাত্রী চাপ বেড়ে এই চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লিটারে পৌঁছায়। কিন্তু চলতি ৭ মার্চ থেকে জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কোম্পানিই অকটেন পাচ্ছে না।

ঈদযাত্রা ও বিকল্প পরিবহনের চাপ

ঈদযাত্রা শুরু হওয়ায় স্পিডবোট চালু না থাকায় যাত্রীদের ভিড় ট্রলার ও লঞ্চে বেড়েছে। যাত্রী মুক্তাদির হোসেন বলেন, "সন্দ্বীপের মানুষের কাছে স্পিডবোটই সবচেয়ে দ্রুত ও জনপ্রিয় যাতায়াতের মাধ্যম। কুমিরা ঘাটের বিকল্প হিসেবে বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া নৌপথে ফেরি চলাচল করছে, কিন্তু ঈদের সময় যাত্রী চাপ বাড়লে ফেরি দিয়ে সব যাত্রী সামাল দেওয়া কঠিন হবে।"

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আশার আলো

সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, "ঈদ সামনে রেখে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে তেল কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ঈদের আগেই এই সমস্যার সমাধান হবে।" তবে এখনো পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান না আসায় যাত্রী ও কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে।

এই সংকট কাটাতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে ঈদযাত্রায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।