জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপ: ভারত-চীনসহ বহু দেশের সঙ্গে যোগাযোগ
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপ: বহু দেশের যোগাযোগ

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপ: ভারত-চীনসহ বহু দেশের সঙ্গে যোগাযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বাকবিতণ্ডা এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

সরকারের যোগাযোগ ও পদক্ষেপ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা শিগগিরই কেটে যাবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি বলছে, দেশেই উৎপাদন হওয়ায় পেট্রোল বা অকটেন সংকটের শঙ্কা নেই, তবে ডিজেল নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিকল্প উৎসের খোঁজ চলছে।

ভারতের সঙ্গে আলোচনা ও চুক্তি

জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতকে চিঠি দিয়েছে। ১১ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কাছে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা।

অবশ্য বিপিসি ও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে আগের একটি চুক্তির আওতায় পাঁচ হাজার টন ডিজেল বুধবার বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। ২০১৭ সালে হওয়া ওই চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট এক লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ।

বিকল্প উৎসের সন্ধান

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলে ইরানের নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। এমন প্রেক্ষাপটে সংকট মেটাতে বিকল্প উৎসের খোঁজে বাংলাদেশ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের সহায়তাও চেয়েছে বাংলাদেশ।

মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প উৎসের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। চীন এবং ভারত ছাড়াও ব্রুনেই, আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকেও জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে সরকার আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী।

জ্বালানি রেশনিং ও সরবরাহ বৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা মোকাবেলায় সাশ্রয়ী ব্যবহার এর উপর শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পরিস্থিতি সামলাতে গত ৫ মার্চ ১১ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

বুধবার নিজেদের সবশেষ বার্তায় বিভাগীয় পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেলের গড় বিক্রয় হতে ২৫ শতাংশ হ্রাস এর পরিবর্তে বর্তমানে ১৫ শতাংশ হ্রাস করে ফিলিং স্টেশন প্রতি বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি যেসব দেশের হাতে রয়েছে তাদের সিদ্ধান্ত আর আমাদের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এক হবে না, অপশন কম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারকে কিছুটা টাইট স্টেপ তো নিতেই হতো, অযাচিত কোনো পদক্ষেপ তো এখনও চোখে পড়েনি।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির দুই সপ্তাহ না যেতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। ১০ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যুদ্ধ প্রায় সম্পন্ন বলে মন্তব্য করার পর তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী তেল বাজার স্থিতিশীল করার বিকল্প উপায় নিয়ে জি-৭ দেশগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ। জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা এবং সরকারি কর্মচারিদের জ্বালানি ভাতা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তানও।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। জ্বালানিমন্ত্রীর মতে, জ্বালানির মজুদ বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস থেকে প্রাপ্তি সাপেক্ষে ধীরে ধীরে জ্বালানি রেশনিং প্রক্রিয়া শিথিল করা হবে।