মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশের বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থার আশঙ্কা
জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশের বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল ও গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে, যেখানে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জ্বালানির অভাবে বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করতে পারছে না অধিকাংশ লাইটার জাহাজ। বন্দর সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তেলের সংকট যদি স্বাভাবিক না হয়, তবে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

মোংলা বন্দরে লাইটার জাহাজের সংকট

মোংলা বন্দরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, বহির্নোঙরে বিদেশ থেকে আসা বড় জাহাজগুলো ড্রাফটের কারণে জেটি বা পশুর চ্যানেলে ভিড়তে অক্ষম। লাইটার জাহাজের মাধ্যমে এই বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে জেটি ও দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে পাঠানো হয়। দেশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক প্রায় এক হাজার লাইটার জাহাজের ওপর নির্ভরশীল। তবে সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে বিপাকে পড়েছে এসব লাইটার জাহাজ। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং করার ফলে অনেক জাহাজ প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে অচল হয়ে পড়েছে।

লাইটার জাহাজ মালিক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘বন্দরের ফেয়ারওয়ে এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য আমার লাইটার জাহাজ ভাড়া চাওয়া হয়। ফেয়ারওয়ে এলাকা মোংলা থেকে ১৩১ কিলোমিটার দূরে। সেই নৌপথে যাওয়া ও আসার জন্য ১৮০০ থেকে দুই হাজার লিটার ডিজেল তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিপো থেকে সেই তেল না পাওয়ায় আমার জাহাজ ফেয়ারওয়েতে যেতে পারেনি। এ রকম শতাধিক লাইটার জাহাজ তেল সংকটে পড়ে আছে।’

আরেক লাইটার জাহাজ মালিক শফিকুল ইসলাম যোগ করেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকটে কোনও লাইটার জাহাজ পণ্য নিয়ে কলকাতায় যেতে পারছে না। আমার আরেকটি জাহাজ ফেয়ারওয়েতে অবস্থান করা জাহাজ থেকে সারবোঝাই করে সেখানে অবস্থান করছে। জ্বালানি তেলের সংকটে সেখান থেকে ছেড়ে আসতে পারছে না। এভাবে চললে বন্দরের কাজে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে।’

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান টুটুল বলেন, ‘তেল সংকটে কোনও লাইটার জাহাজ চলাচল করছে না। ফেয়ারওয়েতে থাকা একটি বড় জাহাজ থেকে কয়লা খালাস করতে পারছি না। এতে আমরা ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। কবে এর সমাধান হবে তাও জানি না।’

বন্দরের লাইটার জাহাজ মালিক ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন যে, বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া গুনতে হবে। পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে গেলে প্রভাব পড়বে বাজার মূল্যের ওপর। ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ ব্যবস্থায়। দ্রুত জ্বালানি তেলের সংকট সামাল দিতে না পারলে মোংলা বন্দর অচল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

চট্টগ্রাম বন্দরে সংকটের ছায়া

চট্টগ্রাম বন্দরেও ডিজেল সরবরাহ কমানোর প্রভাব পড়েছে আমদানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজ চলাচলে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হয়। এরপর নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। এই কাজে ১ হাজার ৫০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। ডিজেল সংকটে নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

লাইটার জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আহ্বায়ক সফিক আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত আছে অন্তত এক হাজার ৫০০ লাইটার জাহাজ। বর্তমানে এসব লাইটার জাহাজে চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। তবে যা পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে টেনেটুনে চলছে। তবে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়নি এখনও।’

বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ উল্লেখ করেন, ‘প্রতিদিন পণ্য পরিবহনের জন্য গড়ে ৭০-৮০টির মতো জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। একেকটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য তিন হাজার লিটার ডিজেল দরকার। তবে অনেকে সরবরাহ না পেয়ে গন্তব্যে যেতে পারছে না।’

বেসরকারি ডিপোগুলোর অবস্থা

একই অবস্থা বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতেও। চট্টগ্রামের ২১টি ডিপোয় রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনা হয়। এরপর কনটেইনারে ভরে বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। আবার কনটেইনারে আমদানি পণ্যও বন্দর থেকে এনে ডিপো থেকে খালাস দেওয়া হয়। এসব কাজের জন্য এক হাজার কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি এবং ২৫০ যন্ত্রপাতি রয়েছে, যেগুলোর জন্য দরকার ডিজেল। তারা ডিপোতে ডিজেল চেয়েও পায়নি।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের কথা জানান। চিঠিতে বলা হয়, ডিপোগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দিনে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড—এই তিনটি কোম্পানি ডিপোগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে ডিপোগুলো জ্বালানি সংকটে পড়বে।

পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘তেল সরবরাহ চলছে। তবে সরকার বলেছে, ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে। এ কারণে কম পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। একেবারে তেল সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। ডিজেল নিয়ে কয়েকটি জাহাজ দেশে এসেছে। ফলে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

বন্দরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও সারসহ শিল্পের কাঁচামালবাহী বড় জাহাজ। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজ কুতুবদিয়া এবং বহির্নোঙর থেকে ছোট জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে। ৫০ হাজার টনের একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটার জাহাজ ব্যবহার হয়। সে হিসাবে কুতুবদিয়া এবং বহির্নোঙর মিলে দিনে ১০০ থেকে ১১০টি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে প্রয়োজন হয় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি লাইটার জাহাজের। বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ তাদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও বাকি আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন থেকে লাইটার জাহাজ বুকিং নেন।