দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে সতর্কতা: বৈশ্বিক সংঘাতে নতুন ঝুঁকি
দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি সম্প্রসারণে সতর্কতা, বৈশ্বিক সংঘাতে ঝুঁকি

দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে সতর্কবার্তা: বৈশ্বিক সংঘাতের ছায়ায় নতুন ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো সম্প্রসারণ নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম)। সংস্থাটির মতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অঞ্চলের দেশগুলো বাড়তি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে, যা তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে।

বৃহৎ বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য হুমকি

গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার অনুযায়ী বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে প্রায় ১০৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প প্রস্তাবিত বা নির্মাণাধীন রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে নেওয়া হলেও, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এগুলোর সাফল্যকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটের ইরানে হামলার পর জ্বালানি বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলেও বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবহন করা হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার এলএনজি আমদানির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

অঞ্চলের এলএনজি নির্ভরতা ও ঝুঁকির মাত্রা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করলে অঞ্চলটি মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের দ্বিগুণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জিইএমের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের উন্নয়নাধীন এলএনজি আমদানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যার পরিমাণ বছরে ১১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণেরও প্রায় ১৭ শতাংশ এই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, যার মোট দৈর্ঘ্য ৩৪ হাজার ১৪৬ কিলোমিটার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এমন এলএনজি আমদানি অবকাঠামো পরিকল্পনা করছে, যা বাস্তবায়িত হলে তাদের বর্তমান সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। অন্যদিকে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্লেষকদের মতামত ও বিকল্প পথ

গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের গ্লোবাল এলএনজি বিশ্লেষক রবার্ট রোজানস্কি বলেন, "এলএনজি আমদানির উপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক মূল্য ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে। নতুন গ্যাস অবকাঠামো নির্মাণের ঝুঁকি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো দেশীয় বিকল্পগুলোই বেশি সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে।"

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গত এক দশকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি সক্ষমতা চালু করেছে, তার দুই থেকে তিন গুণ বেশি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার হার ইউরোপের অনুরূপ প্রকল্পগুলোর তুলনায়ও বেশি, যা অঞ্চলের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করছে।

জিইএমের তেল-গ্যাস কর্মসূচির পরিচালক জুই জলি বলেন, "ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এলএনজির দাম বাড়া ও সরবরাহ সংকুচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলএনজির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।"

এই প্রতিবেদনটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্যময় ও স্থানীয় উৎসের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।