মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশ ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল চাইল
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভারতের বিবেচনাধীন অনুরোধ
রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। এই অনুরোধ বর্তমানে ভারতের কাছে বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপও একই ধরনের অনুরোধ করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং শোধনাগারের সক্ষমতা বিবেচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজার
সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের আঘাতে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর প্রভাবে সৌদি আরব, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনে ব্যহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনও বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। সম্ভাব্য এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার সতর্কতা হিসেবে ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। গত বুধবার ঢাকা থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ জ্বালানি সহযোগিতার ইতিহাস
ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সোয়াল জানান, ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় পরিসরে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন:
- ২০০৭ সাল থেকে সড়ক, রেল ও পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এই জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
- ২০১৭ সালে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
- এই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এর আগে বুধবার সচিবালয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। ওই বৈঠকের পর উভয় পক্ষ থেকেই জানানো হয়, বাংলাদেশ অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে।
অন্যান্য বিষয়ে ভারতের অবস্থান
একই ব্রিফিংয়ে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বিবৃতির বাইরে তার বলার কিছু নেই।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশের ডিজিএফআই প্রধান সম্প্রতি ভারতে এসেছিলেন এবং ‘রাইসিনা ডায়ালগ’-এর ফাঁকে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। তবে এই আলোচনার বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ সরকার এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতা কামনা করছে। ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
