ইরানের ড্রোন হামলায় সৌদি শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড, বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা
ইরানের হামলায় সৌদি শোধনাগার বন্ধ, বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

ইরানের ড্রোন হামলায় সৌদি শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড, জ্বালানি বাজারে উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরানের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর রাস তানুরা শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতামূলকভাবে শোধনাগারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত, দামে ঊর্ধ্বগতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ইরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, ফলে অন্তত ১৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার পারস্য উপসাগরে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে। এই পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতিমধ্যে ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এছাড়া, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বিশ্ববাজারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন ডলারের মান বৃদ্ধিও জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাতার ইতিমধ্যে এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে সরাসরি প্রভাব

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত অবস্থায় সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগার থেকে আসে। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের মতে, শোধনাগার বন্ধ থাকায় সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১ থেকে ৩ মার্চের মধ্যে রাস তানুরা থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলার কথা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনিশ্চিত।

রাস তানুরা থেকে তেল আনতে হলে জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হয়, যা বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনিশ্চিত। এই যাত্রা বিলম্বিত হলে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

গ্যাস সরবরাহেও অনিশ্চয়তা

দেশের গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে, যার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১১৫টি কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একটি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১২ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও এরপর নতুন জাহাজ আসা ব্যাহত হলে সংকট দেখা দিতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সরকার রাস তানুরা শোধনাগার বন্ধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সরবরাহ ব্যাহত না হয় সে জন্য বিকল্প উৎস নিয়ে আলোচনা চলছে।

মজুত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত ২ লাখ ১৭ হাজার ৩১৭ টন, যা দিয়ে ১৪-১৫ দিন চলতে পারে। পেট্রোলের মজুত ২১ হাজার ৭০৫ টন, অকটেনের ৩৪ হাজার ১৩৩ টন এবং ফার্নেস তেলের ৭৮ হাজার ২৭৮ টন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, একাধিক চালান বিলম্বিত হলে কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুম ও বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ঘোর বিপদের শঙ্কা রয়েছে, কারণ বিভিন্ন দেশ আমদানির জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে এবং দাম বাড়তে থাকবে। তিনি দ্রুত নতুন উৎস খুঁজে সরবরাহ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়েও জ্বালানি বাজারে অনুরূপ অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, যখন এলএনজির দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশকে সাত মাসের জন্য খোলাবাজার থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অনুরূপ সংকটের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।