মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আপাতত জ্বালানি তেলে তাৎক্ষণিক সংকট না থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা ও তেলের দাম বৃদ্ধি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, এই জলপথের দুই প্রবেশমুখে শত শত জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কাতার এনার্জির এলএনজি উৎপাদন বন্ধ

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ‘কাতার এনার্জি’। সোমবার কাতার সরকারের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি উৎস ও বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেলের প্রধান উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। পরিশোধিত তেল আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে। এলএনজি আমদানি করা হয় কাতার ও ওমান থেকে।

বর্তমানে দেশে এলএনজি পরিস্থিতি সম্পর্কে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, ‘‘দেশীয় গ্যাস ও আমদানিকৃত এলএনজি—দুই উৎস থেকেই সরবরাহ আসে। দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, সেখানে সীমিত পরিমাণ মজুত রাখা যায়। ইতোমধ্যে আমদানি করা ছয়টি কার্গোর মধ্যে চারটি দেশে এসে পৌঁছেছে, দুটি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা আছে। তবে বাকি কার্গোর উৎস হরমুজ প্রণালি নয় বলে তা নিয়ে উদ্বেগ কম।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সম্ভাব্য সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের ইমেইল করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে সমস্যা না হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।’’

এলপিজি সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি

দেশে বছরে অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যা পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ জানান, ‘‘ঈদ পর্যন্ত সংকটের আশঙ্কা নেই। ইতোমধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি এসেছে, চলতি মাসে আসার কথা আরও ১ লাখ ৯০ হাজার টন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলে বড় প্রভাব পড়বে না।’’

জ্বালানি তেলের মজুত সম্পর্কে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, দেশে ৩৬ দিনের মজুত সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মজুত রয়েছে ১৫ দিনের। সমুদ্রপথে ও খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২০ থেকে ২৫ দিনের তেল।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সরকারের অবস্থান

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে বড় সংকট হবে না। তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত বন্ধ না হলে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হবে এবং আমদানি ব্যয় বাড়বে।’’ তিনি আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোরদার ও অন্তত তিন মাসের মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘‘ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও সোমবার (২ মার্চ) পর্যন্ত বাংলাদেশের চিন্তার কোনও কারণ নেই।’’ তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীণ ঘুরে আসতে হয়, যা জাহাজ ভাড়া বাড়িয়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করতে পারে, তবে এখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।