বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি বকেয়া, নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সরকার। রমজানের পরপরই সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সমাধান খুঁজতে বেগ পেতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন ক্ষমতা

বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ বছর সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। সারাদেশে বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ। দেশে একদিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই, ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।

বিপুল পরিমাণ বকেয়া দেনা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পায়নি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বলেছেন, "শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এটা বেড়েছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সরকারের থেকে ভর্তুকি সেটা মাইনাস হচ্ছে এভাবে হতে হতে এ পর্যায়ে এসেছে।" অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলে জানিয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

জ্বালানি সংকট ও আমদানি চ্যালেঞ্জ

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান করে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস, কয়লা এবং তেলের ব্যবহার হয়। এই জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করতে হয়। এছাড়া তেল ও কয়লা প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলছেন, "এখন থেকে এক মাস পরে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করি, এলএনজি ইমপোর্ট করি এবং কয়লা আমদানি করি, কিন্তু প্রশ্ন হলো এটার জন্য যতটুকু খরচ হবে, যতটা ডলার লাগবে সেটা কি দেয়া হবে কিনা।"

বেসরকারি কোম্পানির আশঙ্কা

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংগঠন বিপপা বলছে, সরকার শিগগিরই বকেয়া পরিশোধ শুরু না করলে গরমে চাহিদামত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হবে। তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বলছে, বিলের বকেয়া কমিয়ে চার-পাঁচ মাসে না আনলে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কোম্পানি নিজেরাই অধিকাংশ তেল আমদানি করে। এলসি খোলার পর ৪০-৪৫ দিন লেগে যায় আমদানি করা তেল দেশে আসতে।

বিপপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলসি খুলতে সমস্যার কারণে এরই মধ্যে তেলের নিট মজুদ কমেছে। গত জানুয়ারিতে যে মজুদ এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি ছিল, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসে নিট মজুদ আশি হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, "অর্থ সংস্থান করে পরিস্থিতি সামাল দিতে 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট' করতে হবে। বিদ্যুতে টোট্যালি ফিনান্সিয়ালি ব্যাংকরাপ্ট করে দিছে। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা-পাওনা। জ্বালানি নাই, জ্বালানি ইমপোর্ট করতে হবে। মোট কথা হলো ভেরি কমপ্লিকেটেড।"

মন্ত্রী আরো বলেন, "তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে। ইমার্জেন্সি হলে চালাবো। যেগুলো বকেয়া আছে তাদেরকে কিছুটা দিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো চালু রাখা তারপরে বসে লংটার্ম চিন্তা-ভাবনা করা।"

সাবেক বিদ্যুৎ জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, "টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের উপর নির্ভর করে, এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। অর্থ পরিশোধ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সক্ষমতা উপর নির্ভর করে। রেভিনিউ সংকটের কারণেই তারা বিল পরিশোধ করতে পারেনি।"

সমাধানের পথ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, তাদের হিসেবে বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। তিনি বলেন, "গত বছরে কয়লার যে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বাৎসরিক ৫৫% লোড ফ্যাক্টরে চলেছে কিন্তু এগুলো চলা উচিত ছিল ৮৫ শতাংশ হারে। তার মানে আরো বেশি বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারতাম কয়লা দিয়ে। কিন্তু কয়লা ইমপোর্ট করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে প্রধান।"

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম পুরো পরিস্থিতির জন্য বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, "প্রথমত হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর দরকার নেই। কয়লার ক্যাপাসিটি আছে সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সেটার প্ল্যান্ট ইউজ ফ্যাক্টর হচ্ছে মাত্র ৪৫%। তরল জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিলে আমাদের সাশ্রয় হয় ২৮-৩০ হাজার কোটি টাকা।"

তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো বন্ধ করে চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে কিনা এ প্রশ্নে ড. ইজাজ হোসেন বলেন, "আপাতত এটা সম্ভব নয়। কয়লা সম্পূর্ণ আমদানি করলেও তেল কিছুটা লাগবে। কারণ ডিমান্ড যখন বেড়ে যায়, পিক টাইমে তখন তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ লাগবে।"

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভর্তুকির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বহুমাত্রিক কৌশল নিতে হবে। যার মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, তেল ভিত্তিক কেন্দ্র কমিয়ে আনা, লোডশেডিং সমন্বয় করার মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে। নতুন সরকারকে বুঝে-শুনে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।