চট্টগ্রামে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ বাড়লেও দাম কমেনি, ভোক্তাদের ভোগান্তি অব্যাহত
চট্টগ্রামে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমেনি, ভোক্তাদের ভোগান্তি

চট্টগ্রামে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমেনি, ভোক্তাদের ভোগান্তি চলছে

চট্টগ্রাম নগরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও দাম কমেনি, ফলে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও কোথাও লাইনের গ্যাসও দিনভর থাকছে না, যা শহরের বহু পরিবারকে বাড়তি খরচের চাপে ফেলেছে।

সরবরাহ বাড়লেও দাম চড়াই রয়ে গেছে

নগরের ষোলশহর, ২ নম্বর গেট, চকবাজার, আতুরার ডিপো ও টেকনিক্যাল এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় দোকানে সিলিন্ডারের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম একই রকম চড়া। টেকনিক্যাল এলাকার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদিয়া ট্রেডিংয়ের কর্ণধার মুহাম্মদ আলী আজম জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছ থেকে তাঁকে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, যা তিনি ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তাঁর মতে, এ দামে কোথাও বিক্রি হচ্ছে না এবং পরিবেশক পর্যায়ে দাম না কমলে খুচরা পর্যায়ে কমানো সম্ভব নয়।

আমদানি ঘাটতি ও বাজার সংকট

দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন, এবং বাজারটি পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫২টি হলেও গত বছর নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত বছরের শেষ দিকে আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় ঘাটতির প্রভাব বাজারে পড়েছে। এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, শহরে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে, এবং এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি আছে। তিনি দাবি করেন, সরবরাহ বাড়লেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে বাড়তি দাম নিচ্ছেন।

ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও বাড়তি দামের চাপ

ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সমস্যা কেবল সুযোগসন্ধানীদের নয়। অনেক দোকানে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদার তুলনায় কম, ফলে দরদামের সুযোগ থাকে না। ক্রেতা বেশি, পণ্য কম—এই বাস্তবতায় বাড়তি দাম যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন সমবায় আবাসিক এলাকায় ভাড়া থাকেন তৌফিক ইসলাম, যিনি গত শনিবার ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘দোকানে সিলিন্ডার ছিল অল্প, দাম কমানোর কথা বলার সুযোগই পাইনি।’

আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর, জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০ জন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সবাইকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে, কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি। নন্দনকানন এলাকার একটি ভবনে ১৮টি ফ্ল্যাটের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, প্রতিদিন তিন-চারটি সিলিন্ডার খালি হয় এবং সবাই বাড়তি দামে কিনছেন, কখনো আবার পাওয়া যাচ্ছে না। আগ্রাবাদের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমানও এক কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছেন।

নজরদারির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা

এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই দর কার্যকর হচ্ছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়া হলে নজরদারি কোথায়—এই প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তার প্রভাব স্থায়ী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

দোকানিরাও স্বস্তিতে নেই। একদিকে ক্রেতার চাপ, অন্যদিকে পরিবেশকের বাড়তি দর—এই দুইয়ের মধ্যে পড়েছেন তাঁরা। ষোলশহর এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘ক্রেতারা মনে করেন, আমরা বেশি নিচ্ছি, কিন্তু পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’ বিভিন্ন এলাকার পাঁচজন খুচরা বিক্রেতা জানান, যে পরিমাণ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে দোকানভাড়া ও শ্রমিকের খরচই কষ্টে ওঠে, মুনাফা কমেছে। তবু বাড়তি দাম রাখার দায় তাঁদের ঘাড়েই পড়ছে।

ভবিষ্যত সম্ভাবনা

পরিবেশক প্রতিষ্ঠান আলী অ্যান্ড সন্সের কর্ণধার আয়ুব আলী চৌধুরী বলেন, আমদানি কম হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে খরচ ওঠে না বলেই অনেককে বাড়তি দাম রাখতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং ১০ রোজার মধ্যেই দাম কমে আসবে। তবে ভোক্তারা আশঙ্কা করছেন, যতক্ষণ না আমদানি বৃদ্ধি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত হয়, ততক্ষণ এই ভোগান্তি চলতে থাকবে।