জ্বালানি তেলের সংকট কাটছে, ফিলিং স্টেশনে ভিড় কমেছে
জ্বালানি তেলের সংকট কাটছে, ফিলিং স্টেশনে ভিড় কমেছে

স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি তেল নিচ্ছেন গ্রাহকেরা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর পরীবাগ ছবি: প্রথম আলো ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন আগের মতো স্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো স্টেশন বেশির ভাগ সময় ফাঁকা, আবার কোনোোটিতে স্বাভাবিক সময়ের মতোই জ্বালানি তেল নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে গাড়ি। ব্যস্ত পাম্পগুলোতে কিছু গাড়ি সারিবদ্ধ হয়ে তেল নিচ্ছে। পাম্পের মালিকেরা বলছেন, মূলত সরবরাহ বাড়ানোর কারণে তিন-চার দিন ধরে চাপ কমে গেছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো বলছে, পাম্পগুলোতে তেলের চাহিদাও কমতে শুরু করেছে।

ভিড় কমার নেপথ্যে কারণ

ভিড় কমার নেপথ্যে কারণ জানতে কথা হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও পেট্রলপাম্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, ভিড় কমাতে একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম দুটি হলো বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো ও মূল্যবৃদ্ধি। এ ছাড়া অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি কমিয়েছে অনিশ্চয়তা। অবৈধ মজুত বন্ধে সরকারের নিয়মিত অভিযান ও ফুয়েল পাস ব্যবস্থাও ভূমিকা রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলা চালায় ইরানে। পরদিন থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। সেই অস্থিরতার প্রভাব পড়ে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে। তেল কিনতে লাইন ধরে মানুষ। গাড়ি আর মানুষের এ লাইন বাড়তে থাকে প্রতিদিন। প্রায় দুই মাস ধরে চলমান এ ভিড় হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাম্পের মালিকেরা বলছেন, মূলত সরবরাহ বাড়ানোর কারণে তিন-চার দিন ধরে চাপ কমে গেছে। তেল বিপণন কোম্পানি বলছে, পাম্পগুলোতে তেলের চাহিদাও কমতে শুরু করেছে। মূলত অকটেন ও পেট্রল নিতে পাম্পে ভিড় করে ঢাকার মানুষ। আর ঢাকার বাইরে ডিজেল নিতেও ভিড় ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিক্রি ও সরবরাহের চিত্র

গত ১ থেকে ৪ মার্চ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিক্রি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তেলের মজুত সংকটের শঙ্কায় রেশনিং চালু করে সরকার। সরবরাহ কমে যাওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কয়েক দিন পর রেশনিং তুলে দিলেও আগের বছরের তুলনায় এবার মার্চে ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ কমেছে। তবে অকটেন বাড়তি সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এপ্রিলে পেট্রল-অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ কমে যায়। এতে ভিড় কমছিল না।

পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, জ্বালানি তেলের স্বল্পতা দেখা দিলে মজুতের প্রবণতা বাড়ে। মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়, তারাও বাড়তি কেনে। সরবরাহ বাড়ানোর পর থেকে এসব প্রবণতা কমে গিয়ে স্বাভাবিক হয়েছে। তাই বাড়তি সরবরাহ ধরে রাখতে হবে।

গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দাম বাড়ানোর পর দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে পৌঁছায় জ্বালানি তেল। ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৫ টাকা। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। এর এক দিন পর গত ২০ এপ্রিল থেকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে ফিলিং স্টেশন থেকে ভিড় কমতে থাকে।

বরাদ্দের চেয়েও বাড়তি সরবরাহ

বিপিসি বলছে, আগের বছরের তুলনায় মার্চে ডিজেল সরবরাহ কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ৮৬২ টন। এবার ২১ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে বিক্রি হয়েছে দিনে ১১ হাজার ৪৭৯ টন। ২০ এপ্রিলের পর গত বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৪৮ টন বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। যদিও বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি। গত ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৬৩ টন। এখন ডিজেলের চাহিদা কমে আসছে। দেশে বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ ডিজেল। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও আবাসিকের জেনারেটর চালাতে এটি ব্যবহৃত হয়।

বিপিসির তথ্য বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালাতে ব্যবহৃত হয় অকটেন। দেশে অকটেন চাহিদার ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়। আর বাকিটা কাঁচামাল আমদানি করে দেশে উৎপাদন করা হয়। গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন। যুদ্ধের কারণে চাহিদা বাড়ায় এবার মার্চে দিনে সরবরাহ ২৬ টন বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২১৯ টন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে সরবরাহ কমে যায়। গত বছরের এপ্রিলে দিনে অকটেন বিক্রি হয়েছে গড়ে ১ হাজার ১৮৫ টন। গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ১২৯ টন অকটেন। পরিস্থিতি উত্তরণে দিনে গড়ে ১ হাজার ৪২২ টন সরবরাহ বরাদ্দ করা হয়। যদিও গত ১০ দিন গড়ে প্রতিদিন সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ টন। তার মানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাজারে অকটেন সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ, যদিও বাড়তি বরাদ্দ ছিল ২০ শতাংশ।

অকটেনের পাশাপাশি মোটরসাইকেলে পেট্রল ব্যবহৃত হয়। পুরোনো ব্যক্তিগত গাড়িতেও কেউ কেউ পেট্রল ব্যবহার করেন। সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা, ঘাস কাটার যন্ত্র চালাতেও পেট্রল ব্যবহৃত হয়। এটি শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ টন। এবার ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে পেট্রল বিক্রি করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টন করে। ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়িয়ে দিনে ১ হাজার ২৮৪ টন করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে গত ১০ দিন গড়ে প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫৮১ টন। গত বছরের চেয়ে সরবরাহ বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

ফুয়েল পাস, অভিযান ও যুদ্ধবিরতি

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি চালু থাকায় জ্বালানি সরবরাহের সংকট নিয়ে ভীতি কমেছে। জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের ভোগান্তি কমাতে সরকার একই সঙ্গে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। পাম্পে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তেলের মজুত নিয়ে গুজব ঠেকাতে প্রচার চালানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর কারণে অবৈধ মজুতদারদের তেল মজুতের প্রবণতা কমে গেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ফুয়েল পাস চালু করায় একই গাড়ি বারবার আসার প্রবণতা বন্ধ হয়ে গেছে। অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে। এর সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বাড়ায় মানুষ স্বস্তিতে তেল নিতে পেরেছে।

পদ্মা তেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের ভীতি কেটে গেছে। সব পাম্পেই বাড়তি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। ফুয়েল পাস চালু হয়েছে। সরকারের একাধিক উদ্যোগ মিলেই ভিড় কমেছে। পাম্পে বাড়তি চাহিদা কমে এসেছে, এখন বরাদ্দের চেয়েও কম নিচ্ছে তেল।

ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিকল্পনা

দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের সংকট নেই। বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পর ফিলিং স্টেশনে ভিড় কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ২৮ এপ্রিল বিক্রির পর ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৮১ হাজার টন। তিনটি জাহাজ থেকে ৭৫ হাজার টন ডিজেল খালাস হচ্ছে। খালাসের অপেক্ষায় আছে আরও ৩৩ হাজার টন। মে মাসে ডিজেলের চাহিদা ৩ লাখ ৭০ হাজার টন। ৩ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল আসার কথা নিশ্চিত করেছে সরবরাহকারীরা।

বিপিসি সূত্র বলছে, মে মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৭ হাজার টন। স্থানীয় উৎস থেকে ২৪ হাজার টন পাওয়া যাবে। আমদানি হয়ে আসার কথা সাড়ে ২৬ হাজার টন। দেশে অকটেনের মজুত আছে ৪২ হাজার ৯৩৩ টন। পেট্রলের মজুত আছে ১৭ হাজার ৬৪০ টন। নিয়মিত পেট্রল আসছে দেশীয় উৎস থেকে। এর বাইরে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়া থেকে ডিজেল ও অকটেন আমদানি হলে মজুত বাড়তে পারে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য তেল কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।