রূপপুরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ে পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ
রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিংয়ে পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হচ্ছে। এই কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বহুস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে ঐতিহাসিক এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কারিগরি দিক নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান।

পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মানদণ্ড অনুযায়ী এখানে ‘পাঁচ স্তরের’ নিছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। রূপপুরে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘তৃতীয় প্রজন্মের (প্লাস)’ ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাশিয়ার রোসাটমের নকশা করা। আইএইএ’র সুপারিশ অনুযায়ী এখানে ‘বহুস্তরীয় সুরক্ষা’ (ডিফেন্স-ইন-ডেপথ) নীতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে।

অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম

তিনি আরও বলেন, রিয়্যাক্টরে উন্নত ‘অ্যাকটিভ সেফটি সিস্টেম’ রয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুল্লি বন্ধ (শাটডাউন) করে এবং কোর শীতল রাখে। পাশাপাশি ‘প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম’ বিদ্যুৎ বা মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ডাবল কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচার, কোর ক্যাচার এবং হাইড্রোজেন রিকম্বাইনার, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুকুশিমা থেকে শিক্ষা

জাহেদুল হাসান জানান, ২০১১ সালের ফুকুশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। এমনকি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতিতেও চুল্লি নিরাপদ রাখতে সক্ষম এই প্রযুক্তি। নিরাপত্তা মনিটরিংয়ের জন্য প্ল্যান্টে সাত হাজারের বেশি স্বয়ংক্রিয় ইন্টারলক ও সেফটি ফাংশন যুক্ত রয়েছে। যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এসব ব্যবস্থা নিজে থেকেই সক্রিয় হয়ে, কোনো অপারেটর বা মানুষ উপস্থিত না থাকলেও সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুল্লিকে বন্ধ (শাটডাউন) করে দিতে সক্ষম।

২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ

এছাড়া কেন্দ্রটির সব কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, মাটি স্থিতিশীলকরণ, কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতসহ নানা বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ ও গ্রিড স্থিতিশীলতা

ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা পর্যায়ে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত বেসলোড পাওয়ার সরবরাহ করে, তাই গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও লোড ব্যালান্স ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। গ্রিড শক্তিশালী করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন (ট্রান্সমিশন লাইন) এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

পারমাণবিক বর্জ্য সম্পর্কে জাহেদুল হাসান বলেন, সাধারণত প্রায় এক বছর পরিচালনার পর ব্যবহৃত জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) চুল্লি থেকে বের করা হয়। এটি চুল্লির কাছাকাছি বিশেষভাবে নকশা করা পুলে (স্পেন্ট ফুয়েল পুল) সংরক্ষণ করা হবে। এই পুলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহৃত জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা ফেরত পাঠানো নিশ্চিত করা হবে।

পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর সময়সীমা

রূপপুরের মতো একটি আধুনিক ‘তৃতীয় প্রজন্মের (প্লাস)’ পারমাণবিক কেন্দ্র পুরোদমে চালাতে কয়েকটি ধাপ পার হতে হবে। সাধারণত একটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর জন্য ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে বলেও জানান তিনি।