রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ফুয়েল লোডিং লাইসেন্স পেল, উৎপাদন কবে শুরু হবে?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ফুয়েল লোডিং লাইসেন্স পেল

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ফুয়েল লোডিং লাইসেন্স পেল, উৎপাদন কবে শুরু হবে?

বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ এর জন্য কমিশনিং লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এই লাইসেন্স পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে আরও ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে।

সরকারের দাবি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষেই প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং উদ্ধোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী দাবি করেন, ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল কাজ শুরু হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পর পাইলট অপারেশন শুরু হবে, যা অন্তত ছয়মাস থেকে এক বছর সময় নিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এটা একটা পাইলট অপারেশন। এ সময়ে পাওয়ার তৈরির মাধ্যমে সিনক্রোনাইজেশন, টারবাইন জেনারেটর কাজ করছে কি না, ইমার্জেন্সি সব সাপোর্ট কাজ করছে কি না এগুলো সব দেখা হয়।” তিনি আরও যোগ করেন, ফুয়েল লোডিং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রিড সক্ষমতা ও সঞ্চালন লাইনের অবস্থা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য গ্রিড সক্ষমতা এবং সঞ্চালন লাইন তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ করেছে গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান দাবি করেন, ২০২৫ সালের মে মাসেই প্রথম ইউনিটের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ইউনিট ওয়ানের জন্য আমাদের যে কয়টা লাইন দরকার সেগুলো গত বছরের ৩০শে মে'র মধ্যেই শেষ করে ফেলেছি। আমাদের চারটা লাইন রেডি হয়ে আছে তখন থেকেই।”

তিনি জানান, রূপপুর-বাঘাবাড়ি দুটি সার্কিট, রূপপুর-বগুড়া একটি এবং রূপপুর-গোপালগঞ্জ একটি সার্কিট- এই চারটি লাইন প্রস্তুত রয়েছে, যেগুলোর মোট ক্যাপাসিটি চারশ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য গ্রিডের সক্ষমতা তৈরির কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে, যেখানে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপন্ন হয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের নিরাপত্তা নিয়ে কোনোভাবেই আপস করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনায় থাকা অগ্নি নিরাপত্তা, ইভাকুয়েশন প্ল্যান ও জরুরি সাপোর্ট সিস্টেম নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।”

পরমাণু শক্তি কমিশন দাবি করেছে, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সব কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে বিভিন্ন ধাপের পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় আশার আলো হয়ে উঠেছে। যদিও অতীতে একাধিকবার সময়সীমা পিছিয়েছে, এবার সরকার দৃঢ়ভাবে ডিসেম্বরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও সময় লাগবে, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।