চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট: লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত, উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে
গ্রীষ্মের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎহীনতা জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে, শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি, যা দৈনন্দিন কাজকর্ম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লোডশেডিংয়ের তীব্রতা: শহর বনাম গ্রাম
চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে এই সময়সীমা সাত থেকে আট ঘণ্টায় পৌঁছাচ্ছে। দিনের বেলার তুলনায় সন্ধ্যার সময় লোডশেডিং বেশি হচ্ছে, যা পরিবারগুলোর রাতের বেলার কাজকর্মকে ব্যাহত করছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় সাধারণ মানুষ মারাত্মক কষ্ট ভোগ করছেন।
একটি উদাহরণ হিসেবে, গত রোববার বেলা সাড়ে তিনটায় চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় এক মা ঘরের কাজ ফেলে রেখে শিশুদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন। এই দৃশ্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরেও। বিশেষ করে, আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় তারা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারছে না, যা তাদের পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানদের প্রস্তুতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকেরা, যারা এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত মুক্তি চাইছেন।
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন হ্রাস
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানিসংকটই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। পিডিবির চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম মামুনুল বাশরী বলেন, গ্যাসসংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, কখনো কখনো বন্ধও রাখতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও সীমিত রাখা হচ্ছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রেও পানির স্তর কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
উৎপাদন পরিসংখ্যান: অর্ধেকের নিচে
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৭৮ মেগাওয়াট। তবে গত এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে গত শনিবার—দিনে ২ হাজার ১৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর ২ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। অন্য দিনগুলোয় উৎপাদন আরও কম ছিল। গত বৃহস্পতিবার দিনে মাত্র ১ হাজার ১১ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অধিকাংশ দিনই উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটের নিচে ছিল।
পিডিবি সূত্র জানায়, গ্যাসসংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রাউজান বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে প্রায়ই দুই থেকে তিনটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। চালু ইউনিটগুলো থেকেও পূর্ণ সক্ষমতা পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ
চট্টগ্রামে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা কখনো আরও বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। এ কারণে সকাল-সন্ধ্যা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রবর্তক এলাকার একটি বহুতল ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। একেকবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। রাউজানে দিনে সাত থেকে আটবার লোডশেডিং হচ্ছে। নোয়াপাড়া পথেরহাট এলাকায় কর্মরত ব্যাংক কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলাল বলেন, অফিসে থাকাকালীন ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। স্বাভাবিক কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোছাইন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হচ্ছে। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, তাঁদের এলাকায় প্রতিদিন ১৭০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের সংকটে বহুতল ভবন ও অফিস এলাকায় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আয়–উপার্জনেও, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সর্বোপরি, চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা, যাতে জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হতে পারে।



