অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. ফজলে হুদার টেবিলে উপস্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বাজেটের অগ্রাধিকার ও পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা ও অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ
তিনি আরও জানান, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদানের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করতে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি
অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাদের ভোগক্ষমতা ও জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। খাদ্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লাখ পরিবারকে কর্মাভাবকালীন ছয় মাস প্রতি মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সারা দেশে এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ
মন্ত্রী আরও বলেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৪১৯টি উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ দশমিক ১৯ লাখ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন
উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, যদিও এ অঞ্চলের জন্য আলাদা অঙ্কভিত্তিক বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি, তবে সামগ্রিকভাবে ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেন, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিশেষায়িত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড-চেইন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও লজিস্টিকস খাত উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।



