‘স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক সম্প্রতি সিলেটে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি। এতে অংশ নেন সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমেদ, সহকারী পুলিশ সুপার জনি লাল দেব, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানসহ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও ফেরত আসা কর্মীরা। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
মন্ত্রীর বক্তব্য
আরিফুল হক চৌধুরী এমপি বলেন, নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বৈঠকের মাধ্যমে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তিনি জানান, প্রতারণার মাধ্যমে অনেক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন এবং কখনো ঝুঁকি জেনেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আইন ও নীতিমালা সংস্কার এবং কার্যকর কাঠামো তৈরিতে কাজ চলছে। সরকার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। লিবিয়াসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানব পাচারকারী চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের চিহ্নিত করে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনা হবে।
চারটি জেলায় বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপানের শ্রমবাজারের জন্য এন৪ বা এন৫ স্ট্যান্ডার্ডের ভাষা শিক্ষক আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দালালদের টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে ১০০টির বেশি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে এবং অব্যবহৃত সরকারি ভবন ব্যবহার করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে।
বিভাগীয় কমিশনার
খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। তথ্যের অভাব ও দালাল চক্রের কারণে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়। সরকারি জনশক্তি কর্মসংস্থান অফিসের প্রচার ও সক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় দালাল চক্র সক্রিয়। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জেলা পর্যায়ের জনশক্তি অফিসে জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। লিবিয়াসহ কিছু দেশে অমানবিক পরিস্থিতিতে নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক। তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক, মসজিদ ও ইমামদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন। সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিমানবন্দর পরিচালক
মো. হাফিজ আহমেদ বলেন, ওসমানী বিমানবন্দরে প্রবাসী যাত্রীদের জন্য কোনো বাধা সৃষ্টি না করে সেবা ও সহায়তা সহজ ও কার্যকর করাই লক্ষ্য। ঝুঁকিমুক্ত জীবনের আশায় মানুষ নিজেরাই আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সমাজ, পরিবার ও বেকারত্বের চাপ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বিদেশে যেতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন। প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও পরবর্তী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করলে প্রক্রিয়াটি নিরাপদ হবে। দূতাবাসভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্র্যাকের প্রতিনিধি
শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যায়। এটি লজ্জার বিষয়। এক দশক ধরে এই পরিস্থিতি চলছে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ ৮-১০টি জেলার মানুষ এভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। গত পাঁচ দশকেও অভিবাসন খাতে সুশাসন আসেনি। স্থানীয় পর্যায়ে সেবা অপ্রতুল, রিক্রুটিং এজেন্সি শহরকেন্দ্রিক, ফলে দালাল চক্র সক্রিয়। কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার। ব্র্যাক অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার কমাতে কাজ করছে। ফেরত আসাদের পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গত আট বছরে বিমানবন্দরে প্রায় ৩৯ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে পাঠ্যক্রমে সচেতনতা যুক্ত করা, স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা এবং রাষ্ট্রের উদ্যোগ জরুরি।
পুলিশ কর্মকর্তা
জনি লাল দেব বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগে জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিন শ জনের বেশি সদস্য থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রায় এক শ জন কর্মরত। বিমানবন্দর–সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানব পাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের একটি সক্রিয় গোষ্ঠী রয়েছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ চলছে। প্রথমবার বিদেশে যাওয়া অনেক মানুষকে বিভিন্ন চক্র সহজ লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মাদকদ্রব্য বা চোরাচালানের কাজে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে। আমরা এসব ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধ এবং যাত্রীদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
জেলা কর্মসংস্থান অফিস
মো. নাজমুস সাকিব বলেন, সরকারি মাধ্যমে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের নিবন্ধন, আঙুলের ছাপ ও তিন দিনের প্রাক্-সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রায় ২ হাজার ৯০০ লাইসেন্সধারী এজেন্সি বিদেশে কর্মী পাঠায়, কিন্তু সবাই ঢাকাকেন্দ্রিক। সিলেটে মাত্র কয়েকটি এজেন্সি সরাসরি কাজ করে, বাকিগুলো ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে দালাল হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালে ৩৫ হাজার ২৯০ জন এবং ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬ হাজার ২৯০ জনের নিবন্ধন ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছে। সিলেটে আরও শতাধিক লাইসেন্সধারী এজেন্সি থাকা এবং একটি রেটিং–ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
পাসপোর্ট অফিস
মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, সিলেটের তরুণদের মধ্যে যেকোনোভাবে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। অধিকাংশেরই কারিগরি দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা কম। বর্তমানে পাসপোর্ট সেবার মান ভালো হয়েছে। তিন ধরনের সেবা রয়েছে—সাধারণ, জরুরি ও অতি জরুরি। সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার ও অভিভাবকদের নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে সেই দেশের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন জরুরি। অন্তত ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
জাকির হোসেন বলেন, সিলেট সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জাপানি, ইতালীয়, কোরিয়ান ও আরবি ভাষার কোর্স চালু আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহায়তায় ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স এবং খাদ্য প্রস্তুতসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বড় সমস্যা হলো যাঁদের প্রশিক্ষণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁরা আসেন না; বরং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাই বেশি আসেন। প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ কোনো দক্ষতা অর্জন না করেই বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। বিদেশে যেতে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক
মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী বলেন, সরকারি মাধ্যমে বিদেশে যেতে প্রায় ১ লাখ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে। এজেন্সিগুলোর লাভ আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়, যা যুক্তিযুক্ত নয়। অনেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যার মাসিক কিস্তি প্রায় ১৪ হাজার টাকা। বিদেশে গিয়ে কাজ পেতে চার থেকে পাঁচ মাস লেগে যায়, ফলে ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত হন। অবৈধ ও অনিয়মিতভাবে বিদেশযাত্রার ক্ষতি ভয়াবহ।
সাংবাদিকদের মতামত
মুকতাবিস-উন-নূর বলেন, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মৃত্যু গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বৈধভাবেও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি ও বেতন পান না, নারী কর্মীরা যৌন হয়রানির শিকার হন। প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞানের অভাবে শ্রমিকেরা নিম্নমানের কাজে যুক্ত থাকেন। প্রতিটি জেলায় ভাষা শিক্ষা ও কাজভিত্তিক ন্যূনতম প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। নতুন শ্রমবাজার যেমন জাপানে সম্ভাবনা থাকলেও ভাষা শিক্ষার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিদেশে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া শিক্ষার্থীরা কাজের জন্য থেকে যান, ফলে আইনি জটিলতায় পড়েন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, গত ১০ বছরে অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, আড়াই লাখের বেশি মানুষ অবৈধ পথে পাচার হয়ে বিদেশে গেছেন এবং অন্তত ১৫ হাজার মানুষ বন্দী হয়েছেন। সিলেট অঞ্চলের দালালচক্র ও ঢাকাভিত্তিক সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়ার মূল চালিকা শক্তি। সিলেটে দেড় শতাধিক ট্রাভেল এজেন্সি লাইসেন্সধারী হলেও পাঁচ শতাধিক এজেন্সি অবৈধভাবে সক্রিয়। শিক্ষার ঘাটতিও বড় কারণ। সিলেট অঞ্চলে এসএসসি পর্যায়ে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে।
ফেরত আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতা
রোকসানা আক্তার বলেন, সৌদি আরবে গিয়ে কাজের জায়গায় নির্যাতনের শিকার হন। ঋণ করে দেশে ফিরে আসেন। সামাজিকভাবে অপমান ও অবহেলার মুখে পড়েন। ব্র্যাকের প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের সহায়তায় একটি দোকান করতে সক্ষম হন এবং ‘জয়িতা’ পুরস্কার পান। দালাল চক্র বন্ধে সরকারকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সুজন মিয়া বলেন, জীবিকার তাগিদে ওমান, দুবাই, কাতার, ইরান, তুরস্ক, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, ইতালি ও ফ্রান্সে কাজ করেছেন। বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার চেষ্টা করেও ধরা পড়ে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে কৃষিকাজ ও পোলট্রি ফার্ম চালু করেন। অস্ট্রেলিয়ার জন্য ভুয়া ভিসায় ১৭ লাখ টাকা হারান। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সুপারিশ
- সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
- মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অভিবাসন ও মানব পাচার যুক্ত করতে হবে।
- অসাধু দালাল চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে।
- লিবিয়া এবং অন্য দেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- বিদেশযাত্রার আগে বাধ্যতামূলক কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ চালু করা।
- জেলা পর্যায়ে রিক্রুটিং এজেন্সির সেবা বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
- অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনতে সরকার–নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের সীমা কার্যকর করা।
- ফেরত আসা কর্মীদের জন্য পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা বাড়াতে হবে।
- অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।



